রবিবার ৮ই নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৩শে কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>
জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ

সমঝোতামূলক বিশ্ব প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘকে কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখতে চায় বাংলাদেশ

ফোকাসবাংলা২৪ ডেস্ক   |   শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬   |   প্রিন্ট

সমঝোতামূলক বিশ্ব প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘকে কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখতে চায় বাংলাদেশ

জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ: সমঝোতামূলক বিশ্ব প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘকে কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখতে চায় বাংলাদেশ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, সমঝোতামূলক বিশ্ব সমাজ প্রতিষ্ঠার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বাংলাদেশ জাতিসংঘকে দেখতে চায়। বিশ্বায়নের যুগে বিশ্বের কোনো প্রান্তে সংঘাত বা সংকট সৃষ্টি হলে তার প্রভাব অন্য দেশগুলোর ওপরও পড়ে। তাই যেকোনো সংঘাতের সমাধান আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে হওয়া উচিত।

বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

ভাষণের শুরুতে তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের নতুন সভাপতিকে অভিনন্দন জানান এবং বিদায়ী সভাপতির নেতৃত্বের প্রশংসা করেন। এরপর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের শহীদ, গণতন্ত্র ও অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে আত্মত্যাগকারী এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এখন গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। জনগণই রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস—এ বিশ্বাসের কথা উল্লেখ করে তিনি দেশের উন্নয়ন ও পুনর্গঠনে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরেন।

 

সংঘাতের সমাধানে কূটনীতির ওপর জোর

বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুতি, মানবিক সংকট, জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতা ও মূল্যস্ফীতি বাড়ছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, বিবদমান দেশগুলোর মধ্যে সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থ এবং সম্মান-মর্যাদা রক্ষাকে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তি হতে হবে।

তিনি বলেন, এমন একটি বিশ্ব প্রয়োজন যেখানে মারণাস্ত্রের পরিবর্তে যুক্তি, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবতা পরিবর্তনের হাতিয়ার হবে। বাংলাদেশ পূর্ণাঙ্গ ও সাধারণ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ বলেও জানান তিনি।

ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবির প্রতিও বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।

 

রোহিঙ্গা সংকট

ভাষণে রোহিঙ্গা সংকটকে বাংলাদেশের জন্য বড় মানবিক ও নিরাপত্তাগত চাপ হিসেবে তুলে ধরেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশকে দীর্ঘদিন ধরে আশ্রয় দিতে হচ্ছে।

এর ফলে দেশের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর সমাধানও সেখানেই নিহিত। রোহিঙ্গাদের নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে নিজ দেশে প্রত্যাবাসনকেই তিনি সংকটের সমাধান হিসেবে উল্লেখ করেন।

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত জীবন রক্ষাকারী মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার জন্য জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

 

জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু ন্যায়বিচার, জলবায়ু অর্থায়ন ও অভিযোজন সহায়তার ওপর গুরুত্ব দেন।

তিনি জানান, আগামী পাঁচ বছরে দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। পরিচ্ছন্ন ও সৌর জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং সারাদেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি।

সুন্দরবনে মিঠা পানির প্রবাহ বৃদ্ধি, পানি সংরক্ষণ এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগের কথাও ভাষণে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

 

অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান

বাংলাদেশের বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাংলাদেশকে উৎপাদনশিল্পের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার পদক্ষেপ নিচ্ছে।

তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক ও উদ্ভাবকদের জন্য চলতি অর্থবছরে ৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দের কথা জানান তিনি।

নারী শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও নারী উদ্যোক্তা তৈরিকে সরকারের অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে নারী উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো হয়েছে। স্নাতক পর্যন্ত নারীদের বিনা বেতনে শিক্ষার সুযোগ দেওয়ার কথাও জানান তিনি।

 

‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও সামাজিক সুরক্ষা

প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু ভোটের গণতন্ত্র নয়, অর্থনীতির গণতন্ত্রায়নও নিশ্চিত করতে চায় সরকার। এ লক্ষ্যেই ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড ও ই-হেলথ কার্ডের মতো বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু করা হয়েছে।

নারীর নামে ইস্যু করা ‘ফ্যামিলি কার্ড’কে তিনি নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেন। বিভিন্ন খাতের কার্ডগুলো সমন্বয় করে ভবিষ্যতে একটি ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান।

 

শিক্ষা, প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খেলাধুলাকে সরকারের অগ্রাধিকার খাত হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষা খাতে জিডিপির বরাদ্দ আগামী পাঁচ বছরে পর্যায়ক্রমে ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রযুক্তির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জীবপ্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের নতুন যুগে প্রবেশ করছে বিশ্ব। তবে প্রযুক্তির সুবিধা সবার জন্য সমানভাবে নিশ্চিত না হলে ডিজিটাল বিভাজন ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিভাজনে রূপ নিতে পারে।

উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি ও আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইতিবাচক ব্যবহারে জাতিসংঘের কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।

 

এলডিসি উত্তরণ ও বৈশ্বিক সহযোগিতা

স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রক্রিয়া টেকসই করতে অর্থায়ন, বাজারে প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

কোভিড-১৯ মহামারির অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও সহায়তা অপরিহার্য। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে টিকা, চিকিৎসাসামগ্রী ও রোগ নির্ণয়ের সরঞ্জামের টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

ভাষণের শেষ দিকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নাগরিকদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের মাধ্যমে এমন একটি কল্যাণমুখী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায় বাংলাদেশ, যেখানে ধর্ম, বর্ণ ও দল-মত নির্বিশেষে সবাই সমান অধিকার, সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে নিরাপদে বসবাস করতে পারে।

বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের নীতি ও মূল্যবোধের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে বক্তব্য শেষ করেন প্রধানমন্ত্রী।

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ৪:২৯ পূর্বাহ্ণ | শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

9 News Bd |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

এ বিভাগের আরও খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
শুভ শাহরিয়ার
Contact

৫৫-৫৫/১, রমনা, ঢাকা, বাংলাদেশ।

ফোন : +৮৮০১৯৭১৪৫৮২৫৭

E-mail: info@focusbangla24.com, focusbangla24online@gmail.com