নিজস্ব প্রতিবেদক | বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬ | প্রিন্ট
২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রয়োজনভিত্তিক সীমিত পরিমার্জনের পর ২০২৮ সালের শিক্ষাক্রমে বিস্তৃত পরিবর্তনের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্যে চলতি বছরের অক্টোবর থেকেই বর্তমান শিক্ষাক্রমের মূল্যায়ন ও পর্যালোচনার কাজ শুরু করার পরিকল্পনা করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও অভিভাবকদের মতামতের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হবে শিক্ষাক্রমের কোন কোন ক্ষেত্রে পরিবর্তন প্রয়োজন।
এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, প্রথম পর্যায়ে বর্তমান শিক্ষাক্রমের বাস্তবায়ন পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা হবে। শিক্ষার্থীরা নির্ধারিত শিখনফল কতটা অর্জন করতে পারছে, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকদের কী ধরনের সমস্যা হচ্ছে এবং প্রচলিত মূল্যায়ন পদ্ধতি কতটা কার্যকর—এসব বিষয় পর্যালোচনায় গুরুত্ব পাবে। এ জন্য কারিকুলাম ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রিভিউ কমিটির বৈঠকের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে ২০২৮ সালের শিক্ষাক্রমে কী ধরনের পরিবর্তন আসবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিবর্তন শুধু পাঠ্যবইয়ের অধ্যায় সংযোজন-বিয়োজন বা ভাষাগত সংশোধনে সীমাবদ্ধ থাকবে না। প্রয়োজন অনুযায়ী বিষয়বস্তু, শিখনফল, শিক্ষণ-পদ্ধতি ও মূল্যায়ন ব্যবস্থাও পর্যালোচনা করা হবে।
এনসিটিবি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মওলা বলেন, শিক্ষাক্রমের পরিবর্তন হুট করে সম্ভব নয়। বিস্তৃত পরিসরে পরিমার্জনের জন্য শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত নেওয়া হবে। বর্তমান শিক্ষাক্রমের কোন অংশ কার্যকর এবং কোথায় সংশোধন প্রয়োজন, মূল্যায়নের মাধ্যমে তা চিহ্নিত করা হবে।
তিনি জানান, অক্টোবর থেকে মূল্যায়নের কাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। অংশীজনদের মতামত ও মূল্যায়নের ফলের ভিত্তিতেই পরবর্তী সময়ে পরিবর্তনের ক্ষেত্র নির্ধারণ করা হবে।
২০২৮ সালের শিক্ষাক্রম পর্যালোচনার প্রস্তুতির পাশাপাশি ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে প্রয়োজনভিত্তিক পরিবর্তনের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের অধিকাংশ শ্রেণির পরিমার্জিত বই বর্তমানে মুদ্রণাধীন। চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে নতুন যুক্ত হওয়া চারটি বইয়ের চূড়ান্তকরণের কাজও চলছে।
চতুর্থ শ্রেণিতে ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ ও খেলাধুলাবিষয়ক দুটি বই যুক্ত হচ্ছে। খেলাধুলার বইয়ে ফুটবল, ক্রিকেট, দাবা, সাঁতার, অ্যাথলেটিক্স ও কারাতের প্রাথমিক ধারণা ও কলাকৌশল থাকবে। ষষ্ঠ শ্রেণিতে যুক্ত হচ্ছে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ নামে নতুন বই। আনন্দময় পরিবেশে শেখার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষার প্রতি আগ্রহ তৈরির বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
নতুন বইগুলোর ক্ষেত্রে প্রচলিত বার্ষিক পরীক্ষার পরিবর্তে ধারাবাহিক মূল্যায়নের ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে।
প্রযুক্তিশিক্ষায়ও পরিবর্তন আসছে। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বইয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মেশিন লার্নিং ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারিক দিক যুক্ত করা হচ্ছে। ষষ্ঠ শ্রেণির বাংলা বইয়ে ‘তৃতীয় ভাষা’ শিরোনামে নতুন নিবন্ধ অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।
ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের বিষয়বস্তুও পরিমার্জন করা হয়েছে। সাতজন বীরশ্রেষ্ঠের জীবন ও অবদান, মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন সেক্টর ও ব্রিগেড ফোর্স সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য যুক্ত হচ্ছে। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ এবং নবম-দশম শ্রেণির বাংলা বইয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লেখা ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি’ নিবন্ধ রাখা হচ্ছে।
এ ছাড়া ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে তৎকালীন রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ভূমিকা এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহও বিভিন্ন শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।
এনসিটিবির সদস্য (কারিকুলাম) অধ্যাপক ড. এ কে এম শওকত আলী খান বলেন, শিক্ষার্থীদের বর্তমান সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ জ্ঞান ও দক্ষতা দেওয়ার লক্ষ্যেই ২০২৭ সালের বইয়ে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হয়েছে। ২০২৮ সালের শিক্ষাক্রমে আরও বিস্তৃত পর্যালোচনার মাধ্যমে বিষয়বস্তু, শিখনফল, শিক্ষণ-পদ্ধতি ও মূল্যায়ন ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এদিকে ২০২৮ সালের শিক্ষাক্রম সংশোধন কার্যক্রমের প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে সম্পৃক্ত হওয়ার কথা রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর।
তিনি জানান, শিক্ষাক্রম সংশোধনের আনুষ্ঠানিক কাজ এখনো শুরু হয়নি। শিক্ষা উপদেষ্টা, শিক্ষামন্ত্রী, শিক্ষা সচিব ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের পর কার্যক্রম এগোবে। নতুন চারটি বইয়ের ইংরেজি সংস্করণসহ বিভিন্ন কাজ করতে গিয়ে প্রায় দুই মাস অতিরিক্ত সময় লাগায় নির্ধারিত সময়ের তুলনায় কার্যক্রম কিছুটা পিছিয়েছে বলেও জানান তিনি।
ফলে ২০২৭ সালের পাঠ্যবইয়ে সীমিত পরিমার্জনের পর ২০২৮ সালের শিক্ষাক্রমে বড় পরিবর্তনের প্রস্তুতি শুরু হলেও এর চূড়ান্ত রূপরেখা নির্ভর করছে মাঠপর্যায়ের মূল্যায়ন, অংশীজনদের মতামত এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর।
Posted ৬:২৯ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬
9 News Bd | s s