রাজবাড়ী প্রতিনিধি | বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬ | প্রিন্ট
পৌরাণিক কাহিনি, ঐতিহ্য ও বৈচিত্র্যময় থিমের আয়োজনে শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন রাজবাড়ীর পূজামণ্ডপগুলোর আয়োজকেরা। এ বছর জেলায় ৪৬১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে, যা গত বছরের তুলনায় ২১টি বেশি। আগামী ১৬ অক্টোবর ষষ্ঠীপূজার মধ্য দিয়ে শুরু হবে দুর্গোৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা। উৎসবকে ঘিরে জেলার বিভিন্ন মন্দিরে চলছে প্রতিমা নির্মাণ, মণ্ডপসজ্জা ও আলোকসজ্জার শেষ মুহূর্তের কাজ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, অনেক মন্দিরে প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ হয়েছে। কোথাও প্রতিমায় রং ও তুলির শেষ আঁচড় দিচ্ছেন শিল্পীরা, আবার কোথাও প্যান্ডেল সাজানো ও আলোকসজ্জার কাজে ব্যস্ত কারিগরেরা। দেবী দুর্গার পাশাপাশি দেবী লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশের প্রতিমা সাজিয়ে তোলা হচ্ছে নানা নান্দনিকতায়।
এবারের দুর্গোৎসবে বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে থাকছে পৌরাণিক কাহিনিনির্ভর বিভিন্ন আয়োজন। কোনো মণ্ডপে তুলে ধরা হবে শ্রীরামের অকালবোধন, রাম-রাবণের যুদ্ধ ও রাবণ বধের দৃশ্য। কোথাও আবার একাধিক প্রতিমা ও ভাস্কর্যের মাধ্যমে সনাতন ধর্মের ইতিহাস এবং পৌরাণিক আখ্যান উপস্থাপন করা হবে। এসব আয়োজন ঘিরে আয়োজক ও দর্শনার্থীদের মধ্যে বাড়তি উৎসাহ দেখা যাচ্ছে।
রাজবাড়ী শহরের ধুঞ্চি পূর্বপাড়া সার্বজনীন দুর্গা মন্দির কমিটির সভাপতি শ্রীকান্ত কুমার বিশ্বাস রাহুল বলেন, এবার তাঁদের মন্দিরে দুর্গাপূজার পাশাপাশি শ্রীরামের অকালবোধন, রাম-রাবণের যুদ্ধ ও রাবণ বধের দৃশ্য প্রদর্শন করা হবে। এ ছাড়া ৫২ খণ্ডের প্রতিমায় আদি যোগী, শিব ও শ্রীকৃষ্ণের জন্মসহ বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনি তুলে ধরা হবে। সনাতন ধর্মের ইতিহাস ও পৌরাণিক কাহিনি সম্পর্কে মানুষকে জানানোই তাঁদের এ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য। ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবাইকে মণ্ডপ পরিদর্শনের আমন্ত্রণও জানান তিনি।
জমিদারবাড়িতে দুর্গাপূজার আয়োজন প্রসঙ্গে উৎসব চক্রবর্তী বলেন, প্রতিবছরের মতো এবারও সেখানে পূজার আয়োজন করা হয়েছে। দেবী দুর্গার কাছে তাঁদের প্রার্থনা, সমাজ ও দেশ থেকে অন্যায়, অবিচার ও দুঃখ-কষ্ট দূর হোক। পৃথিবীর সব মানুষের জীবনে শান্তি ও কল্যাণ বয়ে আসুক।
স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বী অভিজিৎ কুমার সোম বলেন, ১৬ অক্টোবর ষষ্ঠীপূজার মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসব শুরু হয়ে ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে শেষ হবে। দেশ ও জাতির মঙ্গলের পাশাপাশি জাতি, ধর্ম ও বর্ণনির্বিশেষে সবার শান্তি ও কল্যাণ কামনায় এ পূজা অনুষ্ঠিত হবে। প্রশাসনের সহযোগিতায় যেন শান্তিপূর্ণ পরিবেশে উৎসব উদযাপন করা যায়, সেটিই তাঁদের প্রত্যাশা।
পুলিশ সুপারের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এ বছর রাজবাড়ী সদর উপজেলায় পৌরসভাসহ ১১৮টি, গোয়ালন্দ উপজেলায় পৌরসভাসহ ২৬টি, বালিয়াকান্দি উপজেলায় ১৫৮টি, পাংশা উপজেলায় পৌরসভাসহ ১০৪টি এবং কালুখালী উপজেলায় ৫৫টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে।
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক স্বপন কুমার বিশ্বাস বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার ২১টি মণ্ডপ বেড়েছে। আনন্দঘন পরিবেশে দুর্গাপূজা উদযাপনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। কেন্দ্রীয় নির্দেশনার অনুলিপি প্রতিটি মন্দিরে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে এবং মণ্ডপে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
দুর্গোৎসব নির্বিঘ্ন করতে মণ্ডপগুলোতে আলোকসজ্জা, বিদ্যুৎ সংযোগ, বিকল্প বিদ্যুতের ব্যবস্থা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও ইতোমধ্যে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবক দল গঠনসহ দর্শনার্থীদের নিরাপত্তায় নেওয়া হচ্ছে নানা উদ্যোগ।
রাজবাড়ীর পুলিশ সুপার মীর মনির হোসেন বলেন, দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপনে পুলিশ, ম্যাজিস্ট্রেট, বিজিবি, আনসার, এসআরবি, স্ট্রাইকিং ফোর্স ও মন্দির কমিটির স্বেচ্ছাসেবকেরা দায়িত্ব পালন করবেন। মণ্ডপের নিরাপত্তায় বাইক পার্টি, গোয়েন্দা সদস্য ও সাদাপোশাকের পুলিশ মোতায়েন থাকবে।
তিনি আরও বলেন, এবার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ জন্য স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক ও পূজা কমিটির সদস্যদের সঙ্গে সমন্বয় করে যানবাহন ও জনসমাগম নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে দর্শনার্থীদের নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে পূজা উপভোগের পরিবেশ নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে।
সব মিলিয়ে রাজবাড়ীতে দুর্গোৎসব ঘিরে এখন উৎসবমুখর প্রস্তুতি চলছে। পৌরাণিক কাহিনিনির্ভর ব্যতিক্রমী আয়োজন, ঐতিহ্যবাহী পূজা ও বর্ণিল সাজসজ্জায় এবারও দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করতে চান আয়োজকেরা। তাঁদের প্রত্যাশা, ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, আনন্দ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মধ্য দিয়ে নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হবে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব।
Posted ৬:০২ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬
9 News Bd | s s