নিজস্ব প্রতিবেদক | শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬ | প্রিন্ট

দেশের রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে রাসায়নিক ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের উন্নয়নে একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। ব্যবসায়িক নেতারা বলছেন, অভ্যন্তরীণ রাসায়নিক বাজারের আকার ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি হলেও অতিরিক্ত আমদানি নির্ভরতা, উচ্চ শুল্ক, জ্বালানির অনিশ্চয়তা, জটিল অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং দুর্বল লজিস্টিক ব্যবস্থার কারণে সম্ভাবনাময় এ খাত কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারছে না।
শনিবার রাজধানীর মতিঝিলে ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে আয়োজিত ‘রাসায়নিক নির্ভর রপ্তানিমুখী শিল্পে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ খাতের উন্নয়ন’ শীর্ষক সেমিনারে এসব মতামত উঠে আসে। অনুষ্ঠানে সরকারি বিভিন্ন সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী সংগঠন এবং শিল্পখাতের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
স্বাগত বক্তব্যে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, দেশের তৈরি পোশাক, বস্ত্র, চামড়া ও ওষুধ শিল্পের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা অনেকাংশে নির্ভর করে শক্তিশালী রাসায়নিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর। কিন্তু শিল্পে ব্যবহৃত রং, কেমিক্যাল ও বিশেষায়িত কাঁচামালের অধিকাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এর পাশাপাশি উচ্চ শুল্ক, পরিবেশগত ছাড়পত্র পেতে দীর্ঘসূত্রিতা, জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং দুর্বল লজিস্টিক অবকাঠামো শিল্পের সম্প্রসারণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, দেশের রপ্তানি খাতকে টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক রাখতে রাসায়নিক ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানো এখন আর শুধু একটি পরিকল্পনার বিষয় নয়, বরং এটি জাতীয় অর্থনীতির জন্য কৌশলগত প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে সরকার, বেসরকারি খাত ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমন্বয়ে একটি বাস্তবভিত্তিক রোডম্যাপ প্রণয়ন জরুরি।
অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টের মহাপরিচালক মো. সলিম উল্লাহ বলেন, শিল্পনীতি সংস্কারের কাজ চলমান রয়েছে। রাসায়নিক শিল্পের জন্য পৃথক নীতিমালা প্রয়োজন, নাকি বিদ্যমান শিল্পনীতিতেই নতুন অধ্যায় সংযোজন যথেষ্ট হবে—এ বিষয়ে উদ্যোক্তাদের সুস্পষ্ট প্রস্তাব পেলে সরকার দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। একই সঙ্গে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে সরকার ও বেসরকারি খাতের যৌথ উদ্যোগের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের সদস্য আবুল ফাতাহ মো. বালিগুর রহমান বলেন, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও শিল্পখাতের মধ্যে কার্যকর সংযোগ গড়ে তোলা প্রয়োজন। তিনি শিল্প উদ্যোক্তাদের বিসিএসআইআরের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ও গবেষণালব্ধ পণ্য ব্যবহারের আহ্বান জানান। তাঁর মতে, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তি স্থানান্তর জোরদার করা গেলে রাসায়নিক শিল্পের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এসআর ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আসিফ রাব্বানী। তিনি জানান, দেশের রাসায়নিক বাজারের আকার বর্তমানে ৬ থেকে ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মধ্যে এবং প্রতি বছর এ বাজার ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারে বাড়ছে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ প্রায় ৬ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের রাসায়নিক পণ্য আমদানি করেছে, যার বড় অংশ ব্যবহার হয়েছে তৈরি পোশাক, ওষুধ ও চামড়া শিল্পে।
তিনি বলেন, লজিস্টিক সীমাবদ্ধতা, উচ্চ আমদানি শুল্ক, পর্যাপ্ত শিল্প অবকাঠামোর অভাব এবং কার্যকর সরবরাহ ব্যবস্থা না থাকায় স্থানীয় উৎপাদন কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছাতে পারছে না। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে নীতিমালার আধুনিকায়ন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিরা বলেন, তৈরি পোশাক শিল্পে সরকার যেভাবে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের বিকাশে নীতিগত সহায়তা দিয়েছে, রাসায়নিক শিল্পেও একই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আমদানি ব্যয় হ্রাস এবং রপ্তানি আয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে।
বিজিএমইএর পরিচালক শেখ এইচ এম মোস্তাফিজ বলেন, আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে স্থানীয়ভাবে রাসায়নিক উৎপাদন বাড়াতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ এবং বিশেষায়িত শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার বিকল্প নেই।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি এম. মোসাদ্দেক হোসেন বলেন, শক্তিশালী কেমিক্যাল ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে গবেষণা, দক্ষ জনবল তৈরি এবং শিল্প-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো জরুরি।
ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক ড. মো. আক্তার হোসেন বলেন, এপিআই শিল্পপার্কের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নের গতি প্রত্যাশার তুলনায় ধীর হওয়ায় উদ্যোক্তাদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে। দ্রুত অবকাঠামো উন্নয়ন সম্পন্ন হলে দেশীয় ওষুধ শিল্প আরও বেশি উপকৃত হবে।
বাংলাদেশ এগ্রো-কেমিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কেএসএম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কৃষি রাসায়নিক উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামালের ওপর উচ্চ শুল্ক স্থানীয় শিল্পের বিকাশে বড় প্রতিবন্ধকতা। তিনি এ খাতে কর ও শুল্ক সহায়তা বৃদ্ধির আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মো. শাহীন আহমেদ বলেন, চামড়া শিল্পে ব্যবহৃত অধিকাংশ রাসায়নিক বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। তাই উৎপাদন ব্যয় কমাতে আমদানি পর্যায়ে বিদ্যমান শুল্ক কাঠামো পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের দ্বিতীয় সচিব সুরাইয়া সুলতানা জানান, স্থানীয় রাসায়নিক উৎপাদন উৎসাহিত করতে সরকার ধাপে ধাপে শুল্কহার সমন্বয় করছে। পাশাপাশি বন্ডেড ওয়্যারহাউস লাইসেন্স প্রদানের পুরো প্রক্রিয়া অনলাইনে নিয়ে আসা হয়েছে, যার সুফল উদ্যোক্তারা শিগগিরই পাবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জিয়াউল হক বলেন, শিল্পায়নের পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তিনি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ রাসায়নিক ব্যবহারের আহ্বান জানিয়ে বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।
সেমিনারে ডিসিসিআইর ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী, সহ-সভাপতি মো. সালিম সোলায়মান, পরিচালনা পর্ষদের সদস্য, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি এবং রাসায়নিক শিল্পসংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা অভিন্নভাবে মত দেন, যথাযথ নীতিসহায়তা, গবেষণায় বিনিয়োগ, দক্ষ জনবল উন্নয়ন এবং আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে রাসায়নিক ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প দেশের রপ্তানি খাতকে আরও শক্তিশালী ভিত্তি দিতে সক্ষম হবে।

Posted ১১:২১ এএম | শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬
9 News Bd | s s


