নিজস্ব প্রতিবেদক | বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬ | প্রিন্ট

সমস্যাগ্রস্ত পাঁচটি ইসলামি ব্যাংকে বিতর্কিত মালিক বা শেয়ারধারীদের পুনরায় নিয়ন্ত্রণে ফেরার সুযোগ বাতিলের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ব্যাংক রেজোল্যুশন আইনের বিতর্কিত ১৮(ক) ধারা বাতিলের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গত ১০ এপ্রিল বিএনপি সরকার অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ব্যাংক রেজোল্যুশন অধ্যাদেশকে আইনে রূপ দেয়। তবে সংসদে আইনটি পাসের আগে যুক্ত করা হয় ১৮(ক) ধারা, যেখানে রেজোল্যুশনের আওতায় যাওয়া কোনো ব্যাংকের আগের শেয়ারধারীদের নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে পুনরায় শেয়ার, সম্পদ ও দায়ভার গ্রহণের জন্য আবেদন করার সুযোগ রাখা হয়েছিল।
ধারাটি যুক্ত হওয়ার পর থেকেই ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে সরকার। বিরোধী দল, অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার এবং সুশাসনবিষয়ক সংগঠনগুলো অভিযোগ তোলে যে, এর মাধ্যমে এস আলম গ্রুপসহ বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দেওয়ার পথ তৈরি করা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগে গত বছরের ২ ডিসেম্বর এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক একীভূত হয়ে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ নামে কার্যক্রম শুরু করে। এক্সিম ব্যাংক ছাড়া বাকি চারটি ব্যাংক আগে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ মো. জাহিদ হোসেন মনে করেন, বিতর্কিত ধারাটি বাতিল করা ইতিবাচক পদক্ষেপ হবে। তবে তিনি বলেন, এটি পুরোপুরি বাতিল হচ্ছে নাকি নতুন কোনো বিধান যুক্ত করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ধারাটি বাতিলের পেছনে দুটি প্রধান কারণ রয়েছে। প্রথমত, এটি নিয়ে ব্যাপক জনসমালোচনা তৈরি হয়েছে। দ্বিতীয়ত, বিশ্বব্যাংকের আপত্তি। সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, ধারা বহাল থাকলে বিশ্বব্যাংকের প্রায় ১৬৫ কোটি ডলার ঋণসহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে।
বাংলাদেশের আর্থিক খাত সংস্কার, খেলাপি ঋণ হ্রাস, বাংলাদেশ ব্যাংকের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জ্বালানি ও সার আমদানির জন্য এই অর্থ ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
বর্তমানে একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণ প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা, যা তাদের বিতরণকৃত মোট ঋণের প্রায় ৭৯ শতাংশ। এর মধ্যে ইউনিয়ন ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৯৮ শতাংশ, ফার্স্ট সিকিউরিটির ৯৬ শতাংশ, গ্লোবাল ইসলামীর ৯৫ শতাংশ, সোশ্যাল ইসলামীর ৬২ শতাংশ এবং এক্সিম ব্যাংকের ৪৮ শতাংশ।
এদিকে ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন সংশোধনের জন্য গঠিত সরকারি কমিটির সুপারিশেও পুরোনো মালিকদের ফেরার সুযোগ রাখার প্রস্তাব ছিল না বলে জানা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, সংসদে বিল উত্থাপনের আগে শেষ মুহূর্তে ১৮(ক) ধারা যুক্ত করা হয়েছিল।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) শুরু থেকেই ধারাটির বিরোধিতা করে আসছে। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ব্যাংক খাতকে পুনরায় দুর্নীতি ও লুটপাটের ঝুঁকিতে ফেলার সুযোগ থাকা উচিত নয়। তিনি সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও বলেন, এ সিদ্ধান্ত কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার চাপের কারণে নয়, বরং দেশের স্বার্থেই নেওয়া উচিত।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, বিতর্কিত ধারা বাতিলের সিদ্ধান্ত এখনো নীতিগত পর্যায়ে রয়েছে। চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে আইন সংশোধনের প্রক্রিয়া শুরু হবে। জাতীয় সংসদের চলমান বাজেট অধিবেশনেই সংশোধনী আনা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা রয়েছে।

Posted ৭:০০ এএম | বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬
9 News Bd | s s


