সাঈদ ইসলাম | রবিবার, ০২ আগস্ট ২০২৬ | প্রিন্ট
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি এমন এক বাস্তবতা, যেখানে যুদ্ধের প্রস্তুতি এবং শান্তির আহ্বান প্রায়ই একই সঙ্গে উচ্চারিত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক হামলা স্থগিত রেখে দ্রুত একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর আগ্রহ প্রকাশ সেই বাস্তবতারই নতুন উদাহরণ। প্রথম দৃষ্টিতে এটি শান্তির পক্ষে ইতিবাচক বার্তা মনে হলেও এর পেছনে রয়েছে জটিল কৌশল, অর্থনৈতিক হিসাব এবং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যের প্রশ্ন।
ট্রাম্পের এই অবস্থান কেবল একটি সামরিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি আন্তর্জাতিক কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার এবং মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রতি তেহরানের সমর্থন নিয়ে উদ্বিগ্ন। অন্যদিকে ইরানও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক চাপ এবং সামরিক হুমকিকে নিজেদের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখে। এই দুই অবস্থানের সংঘাত বহু বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল রেখেছে।
যুদ্ধের সম্ভাবনা আপাতত কমে যাওয়ার ফলে সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদনকারী অঞ্চল। এই অঞ্চলে বড় ধরনের সংঘাত শুরু হলে তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়ে যায়। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ঘোষণার পর বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে, কারণ বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন অন্তত স্বল্পমেয়াদে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি কমেছে।
এই স্বস্তি শুধু তেলের বাজারেই সীমাবদ্ধ নয়। আন্তর্জাতিক শেয়ারবাজারেও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। যুদ্ধের আশঙ্কা কমলে বিনিয়োগকারীরা আবার উৎপাদন, প্রযুক্তি, পরিবহন ও আর্থিক খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী হন। বিপরীতে যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়লে স্বর্ণ, সরকারি বন্ড এবং ডলারের মতো নিরাপদ সম্পদের দিকে মূলধন চলে যায়। ফলে ট্রাম্পের ঘোষণাকে বিশ্ববাজার একটি ইতিবাচক সংকেত হিসেবে গ্রহণ করেছে।
তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এই অবস্থান কি সত্যিই শান্তি প্রতিষ্ঠার আন্তরিক প্রচেষ্টা, নাকি এটি আলোচনার টেবিলে ইরানকে আরও বেশি চাপের মধ্যে ফেলার কৌশল?
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাস বলছে, যুক্তরাষ্ট্র বহুবার সামরিক শক্তির সম্ভাব্য ব্যবহারকে আলোচনার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। অর্থাৎ সরাসরি যুদ্ধ শুরু না করেও সামরিক প্রস্তুতি দেখিয়ে প্রতিপক্ষকে সমঝোতায় বাধ্য করার চেষ্টা নতুন কিছু নয়। ট্রাম্পের বর্তমান অবস্থানও সেই কৌশলের অংশ হতে পারে। কারণ একদিকে তিনি হামলা স্থগিতের কথা বলছেন, অন্যদিকে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখার কথাও জানাচ্ছেন।
ইরানের জন্যও পরিস্থিতি সহজ নয়। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দেশটির অর্থনীতিকে চাপে ফেলেছে। মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকট সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। এমন বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং অর্থনৈতিক স্বস্তি ফিরিয়ে আনা তেহরানের অন্যতম অগ্রাধিকার হতে পারে। তবে এর বিনিময়ে কতটা ছাড় দিতে প্রস্তুত, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
এই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আঞ্চলিক নিরাপত্তা। মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো সংঘাত শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন এবং খাদ্য নিরাপত্তার ওপর। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল পরিবাহিত হয়। সেখানে সামান্য অস্থিরতাও আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।
বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এই পরিস্থিতির গুরুত্ব আরও বেশি। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে গেলে দেশের আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পায়, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি হয় এবং পরিবহন ব্যয় থেকে শুরু করে শিল্প উৎপাদন পর্যন্ত প্রায় সব খাতেই এর প্রভাব পড়ে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি বজায় থাকলে বাংলাদেশের অর্থনীতিও তুলনামূলকভাবে স্বস্তিতে থাকে।
এছাড়া ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানিনির্ভর শিল্পও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। যুদ্ধ বা দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি কমিয়ে দিলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন রপ্তানি খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তবে কেবল হামলা স্থগিত করলেই যে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান আসবে, এমনটি মনে করার সুযোগ নেই। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বিশ্বাসের ঘাটতি এখনও গভীর। অতীতের পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে যাওয়া, পরস্পরের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং সামরিক উত্তেজনার ইতিহাস নতুন সমঝোতার পথকে কঠিন করে তুলেছে। ফলে একটি স্থায়ী চুক্তির জন্য উভয় পক্ষকেই পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠনের কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, ট্রাম্পের হামলা স্থগিতের ঘোষণা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে একটি ইতিবাচক সুযোগ সৃষ্টি করেছে। কিন্তু এই সুযোগ কতটা বাস্তব শান্তিতে রূপ নেবে, তা নির্ভর করবে আলোচনার আন্তরিকতা, পারস্পরিক আস্থার পুনর্গঠন এবং আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার কার্যকারিতার ওপর। যদি আলোচনার পথ সফল হয়, তাহলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও তার সুফল পাবে। আর যদি কূটনীতি ব্যর্থ হয়, তাহলে বর্তমান স্বস্তি খুব দ্রুতই নতুন অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতায় রূপ নিতে পারে। তাই এখন বিশ্বের নজর যুদ্ধের প্রস্তুতির দিকে নয়, বরং আলোচনার টেবিলে—যেখানে একটি সফল সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যসহ বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য নতুন আশার দ্বার খুলে দিতে পারে।
লেখক: আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক
Posted ১:১৭ অপরাহ্ণ | রবিবার, ০২ আগস্ট ২০২৬
9 News Bd | s s