| সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬ | প্রিন্ট
মন্জুর হোসাইন:
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের বৈরিতা ২০২৬ সালে এসে নতুন মাত্রা পেয়েছে। সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা, কূটনৈতিক অচলাবস্থা এবং পারস্য উপসাগর ঘিরে সংঘাত শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ নেই—এটি এখন বৈশ্বিক অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।
প্রথমত, এই সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জ্বালানি বাজার। পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের বড় অংশের তেল পরিবহন হয়। এই পথ বন্ধ বা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। ইতোমধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির কারণে তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী, যা বিশ্ববাজারে অস্থিরতা তৈরি করছে। ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলো—বিশেষ করে জ্বালানি আমদানিনির্ভর অর্থনীতি—বড় চাপের মুখে পড়ছে।
দ্বিতীয়ত, এই সংঘাতের প্রভাব সরাসরি বিশ্ব অর্থনীতিতে পড়ছে। বিভিন্ন অঞ্চলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে এবং বেকারত্ব বাড়তে পারে। বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি এড়াতে নিরাপদ সম্পদের দিকে ঝুঁকছেন, যার ফলে শেয়ারবাজারে অস্থিরতা বাড়ছে। সামান্য উত্তেজনাতেই বৈশ্বিক বাজারে বড় ধরনের ওঠানামা দেখা যাচ্ছে।
তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থাও বড় ধরনের ধাক্কা খাচ্ছে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে, ফলে পণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়ছে এবং সরবরাহে বিলম্ব হচ্ছে। এতে খাদ্য, জ্বালানি এবং শিল্পপণ্যের দামে প্রভাব পড়ছে, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেয়।
চতুর্থত, মানবিক সংকটের বিষয়টি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। যুদ্ধের ফলে অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। যুদ্ধ কেবল রাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি সমাজ, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।
পঞ্চমত, এই সংঘাত বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ তৈরি করছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা, অন্যদিকে ইরান ও তার ঘনিষ্ঠ শক্তিগুলো—এই বিভাজন আন্তর্জাতিক কূটনীতিকে আরও জটিল করে তুলছে। একই সঙ্গে চীন, রাশিয়া বা আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ভূমিকা এই সংঘাতকে আরও বহুমাত্রিক করে তুলছে।
সবশেষে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—এই সংঘাত কতদূর গড়াবে? ইতিহাস বলে, মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো যুদ্ধ দ্রুতই বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে। তাই কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা রাখা এখন সবচেয়ে জরুরি। যদিও উভয় পক্ষের মধ্যে অবিশ্বাস রয়ে গেছে, তবুও আলোচনার বিকল্প নেই।
ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত কেবল দুই দেশের দ্বন্দ্ব নয়; এটি আজকের বিশ্বব্যবস্থার একটি বড় পরীক্ষা। অর্থনীতি, রাজনীতি ও মানবিক দিক—সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। তাই এই সংকটের দ্রুত ও শান্তিপূর্ণ সমাধান না হলে, তার মূল্য দিতে হবে পুরো বিশ্বকেই।
লেখক: আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক
Posted ১:০০ অপরাহ্ণ | সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬
9 News Bd | s s