রুদ্র শাহিনুর | শনিবার, ০৯ মে ২০২৬ | প্রিন্ট
২৫শে বৈশাখ বাঙালির জীবনে এক বিশেষ দিন। এই দিনটি শুধু একটি জন্মদিনের স্মরণ নয়, বরং বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মননের এক মহান অধ্যায়ের পুনরুজ্জীবনের দিন। এই দিনেই জন্ম নিয়েছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর—যাঁর সৃষ্টি, চিন্তা ও দর্শন আজও বাঙালির জীবনকে আলোকিত করে চলেছে। তাঁর জন্মবার্ষিকী আমাদের কাছে তাই শুধু আনুষ্ঠানিক উদ্যাপনের উপলক্ষ নয়, বরং নিজের শিকড়, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়কে নতুন করে খুঁজে পাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
রবীন্দ্রনাথ এমন একজন স্রষ্টা, যাঁকে একটি নির্দিষ্ট পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করা যায় না। তিনি ছিলেন কবি, সাহিত্যিক, গীতিকার, সুরকার, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, শিক্ষাবিদ ও দার্শনিক—সব মিলিয়ে এক বিরল প্রতিভার নাম। বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবদান এতটাই গভীর ও বিস্তৃত যে তাঁকে বাদ দিয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য কল্পনা করাই অসম্ভব। তাঁর কবিতায় যেমন আছে প্রেম ও প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য, তেমনি আছে মানবমুক্তি, সাম্য ও ন্যায়ের কথা।
রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্মের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর চিরকালীন আবেদন। সময় বদলেছে, সমাজ বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে—কিন্তু তাঁর লেখা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। “চিত্ত যেথা ভয়শূন্য” কিংবা “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে”—এসব শুধু সাহিত্য নয়, এগুলো আমাদের জীবনচলার মন্ত্র। ব্যক্তিজীবনের সংকট থেকে শুরু করে সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায়ও তাঁর চিন্তা আজও পথ দেখায়।
শুধু সাহিত্যেই নয়, সংগীতেও রবীন্দ্রনাথ এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছেন। তাঁর রচিত গান আমাদের আবেগ, অনুভূতি ও জীবনবোধের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। প্রেম, বিরহ, আনন্দ, বেদনা, দেশপ্রেম কিংবা আধ্যাত্মিকতা—মানবজীবনের এমন কোনো অনুভূতি নেই, যা তাঁর গানে স্থান পায়নি। তাই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে রবীন্দ্রসংগীত মানুষের হৃদয়ে একইভাবে বেঁচে আছে।
রবীন্দ্রনাথ ছিলেন একজন দূরদর্শী শিক্ষাবিদও। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা শুধু পাঠ্যবইয়ের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; শিক্ষা হতে হবে মুক্ত, মানবিক এবং সৃজনশীল। সেই ভাবনা থেকেই তিনি এমন এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন, যেখানে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে, স্বাধীনভাবে জ্ঞান অর্জনের সুযোগ তৈরি হয়। বর্তমান সময়ের প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষাব্যবস্থায় তাঁর এই দর্শন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
মানবতার প্রশ্নে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন আপসহীন। তিনি সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় বিভাজন ও অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে সবসময় সোচ্চার ছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় সে মানুষ। আজ যখন বিশ্বজুড়ে বিভেদ, সহিংসতা ও বিদ্বেষ বাড়ছে, তখন রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদী দর্শন আমাদের জন্য এক বড় প্রেরণা হতে পারে।
রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করার অর্থ কেবল তাঁর গান গাওয়া বা কবিতা আবৃত্তি করা নয়। তাঁকে সত্যিকারভাবে ধারণ করতে হলে তাঁর মূল্যবোধ—মানবতা, উদারতা, স্বাধীন চিন্তা ও সৌন্দর্যবোধ—নিজেদের জীবনে ধারণ করতে হবে। কারণ রবীন্দ্রনাথ কেবল অতীতের কোনো স্মৃতি নন; তিনি বর্তমানের পথপ্রদর্শক এবং ভবিষ্যতেরও প্রেরণা।
২৫শে বৈশাখ তাই আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একজন রবীন্দ্রনাথ কখনো সময়ের গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকেন না। তিনি বেঁচে থাকেন তাঁর সৃষ্টিতে, আমাদের ভাষায়, আমাদের সংস্কৃতিতে এবং সবচেয়ে বেশি আমাদের চেতনায়। যতদিন বাংলা ভাষা থাকবে, যতদিন মানুষ সৌন্দর্য, প্রেম ও মানবতার সন্ধান করবে—ততদিন রবীন্দ্রনাথ থাকবেন অনন্ত, অম্লান।
Posted ১:১৯ অপরাহ্ণ | শনিবার, ০৯ মে ২০২৬
9 News Bd | s s