রবিবার ৮ই নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৩শে কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>

বন্যার পুনরাবৃত্তি নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সমাধান

শায়লা আক্তার   |   শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬   |   প্রিন্ট

বন্যার পুনরাবৃত্তি নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সমাধান

বাংলাদেশে বর্ষা এলেই বন্যার আশঙ্কা নতুন নয়। নদীমাতৃক এই দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, উজানের পানির প্রবাহ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রায় প্রতিবছরই দেশের কোনো না কোনো অঞ্চল বন্যার কবলে পড়ে। কিন্তু প্রতি বছর একই ধরনের দুর্ভোগ, একই ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এবং একই ধরনের ত্রাণনির্ভরতা আমাদের সামনে একটি প্রশ্নই বারবার তুলে ধরে—আমরা কি এখনো বন্যাকে শুধু একটি মৌসুমি দুর্যোগ হিসেবেই দেখছি, নাকি এটিকে একটি দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন-চ্যালেঞ্জ হিসেবে মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছি?

সাম্প্রতিক বন্যায় দেশের বিভিন্ন জেলার লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। তলিয়ে গেছে বসতভিটা, ফসলি জমি, মাছের ঘের ও গ্রামীণ সড়ক। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে, ফলে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম। বিশুদ্ধ পানির সংকট, স্যানিটেশন সমস্যা এবং পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ছে উদ্বেগজনকভাবে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন দিনমজুর, ক্ষুদ্র কৃষক, জেলে ও নিম্নআয়ের মানুষ, যাদের জীবিকা একেবারেই দৈনন্দিন আয়ের ওপর নির্ভরশীল।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঠেকানো সম্ভব নয়, কিন্তু দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অতীতে অনেক সাফল্য দেখিয়েছে। ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, আগাম সতর্কবার্তা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া তারই প্রমাণ। কিন্তু বন্যা ব্যবস্থাপনায় এখনো অনেক সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। অনেক এলাকায় টেকসই বাঁধ নেই, কোথাও অপরিকল্পিত সড়ক ও অবকাঠামো প্রাকৃতিক পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করছে, আবার কোথাও নদী দখল ও ভরাটের কারণে পানি দ্রুত নিষ্কাশনের সুযোগ হারিয়ে যাচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় বন্যার ধরনও বদলে যাচ্ছে। কখনো অল্প সময়ে অতিবৃষ্টি, কখনো পাহাড়ি ঢল, আবার কখনো দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা মানুষের জীবন ও অর্থনীতিকে নতুন করে চাপে ফেলছে। তাই পুরোনো চিন্তা দিয়ে নতুন বাস্তবতার মোকাবিলা সম্ভব নয়। প্রয়োজন আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর পূর্বাভাস ব্যবস্থা, নদী অববাহিকাভিত্তিক সমন্বিত পরিকল্পনা এবং সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয়।

বন্যা মোকাবিলায় শুধু ত্রাণ বিতরণই যথেষ্ট নয়। দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসন, কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহায়তা, কৃষি উপকরণ বিতরণ এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পুনরায় ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে কৃষি খাতকে দ্রুত পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ না নিলে খাদ্য উৎপাদন ও বাজারে মূল্যস্থিতি—দুই ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

উজানের দেশগুলোর সঙ্গে নদীর পানি ব্যবস্থাপনা নিয়েও আরও কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজন। অভিন্ন নদীগুলোর তথ্য বিনিময়, আগাম পানি প্রবাহের পূর্বাভাস এবং যৌথ নদী ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী হলে বন্যা মোকাবিলায় বাংলাদেশ আরও ভালো প্রস্তুতি নিতে পারবে। একই সঙ্গে দেশের নদ-নদী পুনরুদ্ধার, নিয়মিত ড্রেজিং, খাল ও জলাধার সংরক্ষণ এবং জলাভূমি রক্ষার মতো পদক্ষেপকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে।

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সাধারণ জনগণকে দুর্যোগ প্রস্তুতির সঙ্গে আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত করাও জরুরি। ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটিকে আরও কার্যকর করতে হবে। কোথায় আশ্রয়কেন্দ্র, কীভাবে দ্রুত নিরাপদ স্থানে যেতে হবে, কীভাবে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানি সংরক্ষণ করতে হবে—এসব বিষয়ে নিয়মিত জনসচেতনতা কার্যক্রম চালানো প্রয়োজন।

বাংলাদেশের অর্থনীতি, কৃষি এবং খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে বন্যা মোকাবিলা সরাসরি সম্পর্কিত। তাই এটিকে কেবল একটি মানবিক সংকট হিসেবে নয়, বরং একটি উন্নয়ন ও পরিকল্পনার বিষয় হিসেবে দেখতে হবে। দুর্যোগের সময় ত্রাণ বিতরণ অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন এমন অবকাঠামো, নীতি ও ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা, যা ভবিষ্যতের ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে পারে।

প্রতি বর্ষায় একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি কোনো দেশের জন্য কাম্য হতে পারে না। সময় এসেছে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার গণ্ডি পেরিয়ে দীর্ঘমেয়াদি, বিজ্ঞানভিত্তিক এবং সমন্বিত বন্যা ব্যবস্থাপনার পথে এগিয়ে যাওয়ার। আজকের সঠিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগই আগামী দিনের লাখো মানুষের জীবন, জীবিকা এবং অর্থনীতিকে আরও নিরাপদ ও সহনশীল করে তুলতে পারে।

শায়লা আক্তার: শিক্ষক, কলাম লেখক

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ১২:৩২ অপরাহ্ণ | শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬

9 News Bd |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

রানুর কবিতা
(215 বার পঠিত)
advertisement
advertisement
advertisement

এ বিভাগের আরও খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
শুভ শাহরিয়ার
Contact

৫৫-৫৫/১, রমনা, ঢাকা, বাংলাদেশ।

ফোন : +৮৮০১৯৭১৪৫৮২৫৭

E-mail: info@focusbangla24.com, focusbangla24online@gmail.com