নিজস্ব প্রতিবেদক | মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬ | প্রিন্ট
সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তাঁর প্রতিষ্ঠান আরামিট সিমেন্ট পিএলসির বিরুদ্ধে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে ব্যাংক থেকে ১৪১ কোটি ২০ লাখ টাকা আত্মসাৎ ও অর্থ পাচারের অভিযোগে পৃথক তিনটি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মামলাগুলোতে মোট ২৯ জনকে আসামি করা হয়েছে।
মঙ্গলবার দুদকের নিয়মিত মিডিয়া ব্রিফিংয়ে সংস্থাটির জনসংযোগ বিভাগের উপপরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম এ তথ্য জানান।
দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, সিমেন্টের কাঁচামাল কেনার কথা বলে প্রকৃত কোনো ক্রয়-বিক্রয় ছাড়াই ভুয়া বিল-ভাউচার দাখিল করে ব্যাংক থেকে অর্থ নেওয়া হয়। পরে ২৭টি ডিলের মাধ্যমে উত্তোলন করা ১৪১ কোটি ২০ লাখ টাকা বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে হস্তান্তর, স্থানান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে পাচার এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ঘটনায় ২০১৮ সালের ২০ মার্চ আরামিট সিমেন্টের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখার গ্রাহক ইম্পেরিয়াল ট্রেডিংয়ের নামে একটি ডিলের মাধ্যমে ৫৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। এ ঘটনায় ১৬ জনকে আসামি করা হয়েছে।
দ্বিতীয় ঘটনায় ২০১৮ সালের ৪ এপ্রিল থেকে ২০১৯ সালের ২৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ইম্পেরিয়াল ট্রেডিংয়ের নামে ১৭টি ডিলের মাধ্যমে ৪১ কোটি ৬২ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এ মামলায়ও ১৬ জনকে আসামি করা হয়েছে।
তৃতীয় ঘটনায় ২০২০ সালের ৬ আগস্ট থেকে ২০২১ সালের ২৮ মার্চ পর্যন্ত নয়টি ডিলের মাধ্যমে ৪২ কোটি ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়েছে। এ ঘটনায় ২০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
দুদকের নথিতে বলা হয়েছে, আরামিট গ্রুপের মালিক ও তৎকালীন ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে ব্যাংক থেকে ঋণ অনুমোদনে ভূমিকা রাখেন। পরে আরামিট গ্রুপের এক কর্মচারীকে ইম্পেরিয়াল ট্রেডিংয়ের মালিক সাজিয়ে ভুয়া সরবরাহকারী হিসেবে দেখানো হয়। প্রকৃতপক্ষে কোনো পণ্য সরবরাহ না হলেও বিভিন্ন নথি তৈরি করে ডিল অনুমোদন করানো হয় বলে অভিযোগ করেছে দুদক।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ঋণের অর্থ বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর, নগদ উত্তোলন, পূর্বের দায় পরিশোধ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাচার করা হয়েছে। পরে পাচার করা অর্থ দিয়ে সেখানে সম্পদ কেনা এবং যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে অর্থ স্থানান্তরের মাধ্যমে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। দুদকের নথিতে সাইফুজ্জামান চৌধুরীকে অর্থ আত্মসাতের অন্যতম হোতা ও ‘আলটিমেট বেনিফিশিয়ারি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলায় আরামিট সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুকমীলা জামান, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহ আলম, এজিএম মো. আব্দুল আজীজ ও একেএম মারুফকেও আসামি করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে ভুয়া সরবরাহকারী তৈরি, মিথ্যা আবেদন ও পরিদর্শন প্রতিবেদন দাখিল, ডিল অনুমোদন এবং অর্থ স্থানান্তর ও পাচারে সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়েছে।
দুদকের মামলায় ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির জুবলী রোড শাখার একাধিক কর্মকর্তাকেও আসামি করা হয়েছে। পাশাপাশি ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের কামাল বাজার শাখা এবং ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখার কয়েকজন কর্মকর্তার নামও রয়েছে।
দুদকের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তারা কোনো পণ্য সরবরাহ না হলেও বিভিন্ন অফিস নোট, পে-অর্ডার ইস্যু-সংক্রান্ত নির্দেশনা ও অন্যান্য নথিতে স্বাক্ষর করেন। এর মাধ্যমে পরস্পর যোগসাজশে অর্থ আত্মসাতে সহযোগিতা করা হয়েছে।
মামলার নথিতে আরও বলা হয়েছে, ইম্পেরিয়াল ট্রেডিংয়ের মালিক হিসেবে দেখানো মো. আব্দুল আজীজ প্রকৃতপক্ষে আরামিট গ্রুপের এজিএম এবং সাইফুজ্জামান চৌধুরীর ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে কাজ করতেন। তাঁকে ভুয়া সরবরাহকারী হিসেবে ব্যবহার করে ব্যাংক হিসাব খোলা, পরিদর্শন প্রতিবেদন তৈরি এবং অর্থ ছাড়ের ব্যবস্থা করা হয় বলে অভিযোগ করেছে দুদক।
দুদকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে ব্যাংক থেকে নেওয়া অর্থের প্রকৃত ব্যবহার গোপন করে বিভিন্ন মাধ্যমে স্থানান্তর ও রূপান্তর করা হয়েছে। পরে এসব অর্থের একটি অংশ বিদেশে পাচার এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনে ব্যবহার করা হয়েছে বলে তদন্তে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
তিন মামলায় পৃথকভাবে আসামির সংখ্যা ভিন্ন হলেও একই ধরনের অর্থ আত্মসাৎ, জালিয়াতি, যোগসাজশ ও অর্থ পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব অভিযোগের তদন্তের মাধ্যমে অর্থের প্রকৃত গন্তব্য, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ আরও বিস্তারিতভাবে অনুসন্ধান করা হবে বলে জানিয়েছে দুদক।
Posted ১:১০ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬
9 News Bd | s s