রায়হান খান | শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬ | প্রিন্ট
বাংলাদেশের তরুণ সমাজ আজ এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে প্রযুক্তির অগ্রগতি, বিশ্বায়ন ও শিক্ষার বিস্তার তরুণদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে; অন্যদিকে নৈতিক অবক্ষয়, মূল্যবোধের সংকট ও সামাজিক বিচ্যুতি নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। এই দ্বৈত বাস্তবতা আমাদের ভাবতে বাধ্য করে—তরুণ সমাজ কি সত্যিই অধঃপতনের দিকে যাচ্ছে, নাকি আমরা তাদের সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হচ্ছি?
প্রথমেই স্বীকার করতে হবে, তরুণদের মধ্যে পরিবর্তন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার, দ্রুত সাফল্যের আকাঙ্ক্ষা এবং শর্টকাট মানসিকতা তরুণদের একটি অংশকে বিভ্রান্ত করছে। অনেকেই বাস্তব জীবনের সংগ্রামের চেয়ে ভার্চুয়াল জনপ্রিয়তাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এর ফলে ধৈর্য, অধ্যবসায় ও আত্মনিয়ন্ত্রণের মতো মৌলিক গুণগুলো ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে।
শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও এই সমস্যার অন্যতম কারণ। এখনও অনেক ক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষা মুখস্থনির্ভর, যা সৃজনশীলতা ও নৈতিক বিকাশে পর্যাপ্ত ভূমিকা রাখতে পারছে না। ফলে তরুণরা ভালো ফলাফল অর্জন করলেও জীবনের বাস্তব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত হচ্ছে না। শিক্ষা যদি কেবল সার্টিফিকেট অর্জনের মাধ্যম হয়ে যায়, তবে তা সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার বদলে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি করে।
পরিবারের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগে পরিবার ছিল মূল্যবোধ শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র, কিন্তু নগরায়ন ও ব্যস্ততার কারণে অনেক পরিবারেই সেই বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়েছে। বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের মানসিক দূরত্ব বেড়ে যাওয়ায় তরুণরা অনেক সময় ভুল পথে প্রভাবিত হচ্ছে। বন্ধুত্বের নামে খারাপ সঙ্গ, মাদকাসক্তি কিংবা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।
এছাড়া সমাজে আদর্শের সংকটও তরুণদের বিভ্রান্ত করছে। যখন তারা দেখে সমাজে অসৎ পথে সফল হওয়া মানুষদেরই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, তখন তাদের মধ্যে হতাশা জন্ম নেয়। ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য ঝাপসা হয়ে যায়। এই পরিস্থিতি তরুণদের একটি অংশকে হতাশা, ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়।
তবে পুরো তরুণ সমাজকে এককভাবে ‘অধঃপতিত’ বলা অন্যায় হবে। বাংলাদেশের অসংখ্য তরুণ আজও উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা উদ্যোগ, সামাজিক কাজ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল্যের মাধ্যমে দেশের মুখ উজ্জ্বল করছে। প্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং, স্টার্টআপ—সবখানেই তরুণদের ইতিবাচক অবদান দৃশ্যমান। তাই সমস্যা যেমন আছে, সম্ভাবনাও তেমনি বিশাল।
সমাধানের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। প্রথমত, শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষা, সৃজনশীলতা ও দক্ষতা উন্নয়নের ওপর জোর দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, পরিবারকে আবারও মূল্যবোধ গঠনের কেন্দ্র হিসেবে সক্রিয় করতে হবে। তৃতীয়ত, তরুণদের জন্য ইতিবাচক রোল মডেল তৈরি করা জরুরি, যারা সততা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে সফল হয়েছেন। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে এটি জ্ঞান ও সৃজনশীলতার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহৃত হয়, বিভ্রান্তির নয়।
সবশেষে বলা যায়, তরুণ সমাজ কোনো সমস্যার নাম নয়—তারা নিজেই সম্ভাবনার প্রতীক। সঠিক দিকনির্দেশনা, সহমর্মিতা ও সুযোগ পেলে তারাই পারে বাংলাদেশকে একটি উন্নত, মানবিক ও নৈতিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে। তাই সমালোচনার পাশাপাশি তাদের প্রতি আস্থা রাখা এবং সঠিক পথ দেখানোই এখন সময়ের দাবি।
কলাম লেখক, যুক্তরাজ্য
Posted ২:২১ অপরাহ্ণ | শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬
9 News Bd | s s