নিজস্ব প্রতিবেদক | বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬ | প্রিন্ট
ব্যাংক খাতে পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ কমাতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নেওয়া সংস্কার উদ্যোগ থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে বর্তমান সরকার। ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের নতুন খসড়ায় একই পরিবার থেকে সর্বোচ্চ তিনজন পরিচালক রাখার এবং পরিচালকদের একটানা মেয়াদ ছয় বছরের পরিবর্তে নয় বছর করার প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে। পাশাপাশি পরিচালকদের ঋণখেলাপি হওয়া এবং পরিচালনা পর্ষদে স্বতন্ত্র সদস্যের সংখ্যা নিয়েও আগের প্রস্তাবে পরিবর্তন আসছে।
গত ২০ সেপ্টেম্বর আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পর্যালোচনা সভায় এসব বিষয়ে আলোচনা হয়। সভায় বাংলাদেশ ব্যাংক, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) এবং ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত নেওয়া হলেও আইন সংশোধনের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যালোচনার পর খসড়াটি অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় পাঠানো হবে।
বর্তমান আইনে একই পরিবারের তিনজন সদস্য একসঙ্গে একটি ব্যাংকের পরিচালক হতে পারেন। একজন পরিচালক একটানা সর্বোচ্চ ১২ বছর দায়িত্ব পালন করতে পারেন। এরপর তিন বছরের বিরতি দিয়ে আবার পরিচালক হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশ ব্যাংক এক পরিবার থেকে সর্বোচ্চ দুজন পরিচালক রাখা এবং পরিচালকদের টানা মেয়াদ ছয় বছরে সীমিত করার প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু বিএবি এর বিরোধিতা করে। সংগঠনটির যুক্তি, পরিচালকদের সংখ্যা ও মেয়াদ কমালে মালিকানা কাঠামো, অভিজ্ঞতা এবং ব্যাংক পরিচালনায় ধারাবাহিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাদের প্রস্তাব ছিল, মেয়াদ ১২ বছরের পরিবর্তে নয় বছর করা হোক।
বিএবি চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার জানিয়েছেন, সংগঠনটি বর্তমান সরকারের কাছেও নিজেদের মতামত তুলে ধরেছে। নতুন খসড়ায় সেসব মতামত প্রতিফলিত হচ্ছে বলে তিনি ধারণা করছেন।
তবে অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, পরিচালকদের দীর্ঘ সময় দায়িত্বে থাকার সুযোগই অতীতে বিভিন্ন ব্যাংকে পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করেছে। ২০১৮ সালে পরিচালকদের টানা মেয়াদ ছয় বছর থেকে বাড়িয়ে নয় বছর করা হয়। ২০২৩ সালে তা আরও বাড়িয়ে ১২ বছর করা হয়েছিল।
ওই বছর জাতীয় সংসদে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের সময় পরিচালকদের মেয়াদ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। সংসদে সংশোধনী প্রস্তাবের মাধ্যমে টানা ১২ বছর পরিচালক থাকার সুযোগ দেওয়া হলে জাতীয় পার্টির সদস্যরা এর প্রতিবাদ জানান।
একই পরিবারের সদস্যরা ভিন্ন আত্মীয়তার পরিচয়ে পর্ষদে থেকে প্রভাব বিস্তার করতে পারেন—এমন আশঙ্কায় পরিবারের সংজ্ঞা বিস্তৃত করার প্রস্তাব দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা, সন্তান ও ভাই-বোনের পাশাপাশি ভাবি, ভগ্নিপতি, শ্বশুর-শাশুড়ি, শ্যালক-শ্যালিকা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আত্মীয়কে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়।
বিএবি অবশ্য পরিবারের সংজ্ঞা স্বামী-স্ত্রী ও নির্ভরশীলদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার পক্ষে মত দিয়েছে। এ বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও ব্যাংকের পরিচালনায় স্বার্থের সংঘাত কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে, তা সংশোধিত আইনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
বর্তমান বিধান অনুযায়ী, কোনো পরিচালকের নিজের ঋণ বা তাঁর গ্যারান্টি দেওয়া ঋণ খেলাপি হলে তা নিয়মিত করার জন্য দুই মাস সময় পাওয়া যায়। নির্ধারিত সময়ে ঋণ নিয়মিত করতে ব্যর্থ হলে তাঁর পরিচালক পদ হারানোর বিধান রয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের খসড়ায় পরিচালকের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঋণ খেলাপি হলেও সংশ্লিষ্ট পরিচালকের পদ হারানোর প্রস্তাব ছিল। নতুন খসড়ায় এ বিধান বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। একই সঙ্গে পরিচালক পদ হারানোর পর পুনরায় দায়িত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে অপেক্ষার সময় এক বছর থেকে কমিয়ে ছয় মাস করার প্রস্তাব রয়েছে।
এ পরিবর্তনগুলো কার্যকর হলে পরিচালকদের ঋণসংক্রান্ত দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহি দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা।
অন্তর্বর্তী সরকারের খসড়ায় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্যসংখ্যা ২০ থেকে কমিয়ে ১৫ করার এবং অর্ধেক সদস্য স্বতন্ত্র পরিচালক রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। বিএবি এর বিরোধিতা করে স্বতন্ত্র পরিচালকের সংখ্যা দুই থেকে তিনজনের মধ্যে রাখার পক্ষে মত দিয়েছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগও সর্বোচ্চ তিনজন স্বতন্ত্র পরিচালক রাখার বিষয়ে প্রাথমিকভাবে অবস্থান নিয়েছে।
এদিকে, পরিচালনা পর্ষদে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপের ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে। পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার পরিবর্তে তা বহাল রেখেও প্রশাসক নিয়োগের সুযোগ রাখা হতে পারে। পাশাপাশি আমানতকারীদের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠানে নতুন ঋণ, বিনিয়োগ বা মূলধন সরবরাহ বন্ধ করার ক্ষমতা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
অতীতে বিভিন্ন ব্যাংকে বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর প্রভাব, ঋণ অনিয়ম এবং পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। কয়েকটি ব্যাংকের সংকট মোকাবিলায় সরকারকে বিপুল অর্থের মূলধন জোগানোর উদ্যোগও নিতে হয়েছে। ফলে ব্যাংক পরিচালনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর মনে করেন, পরিচালকদের মেয়াদ সীমিত করা, পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ কমানো এবং স্বতন্ত্র পরিচালকের সংখ্যা বাড়ানো সুশাসন প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ উপায়। অন্যদিকে, সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী সতর্ক করেছেন, এসব সংস্কার শিথিল হলে ব্যাংক খাতে অতীতের অনিয়ম আবারও ফিরে আসার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এখনো চূড়ান্ত না হওয়া সংশোধনীতে সরকার কোন অবস্থান নেয়, তা নির্ধারণ করবে ব্যাংকের মালিকানা কাঠামো, পরিচালকদের জবাবদিহি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার ক্ষমতা কতটা কার্যকর হবে।
Posted ৬:৩০ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
9 News Bd | s s