রবিবার ৮ই নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৩শে কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>
চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ, এমডি দুদকের মামলার আসামি

লোকসান, ঋণ কেলেঙ্কারি ও সুশাসনের অভাব আইএফআইসি ব্যাংকে

  |   বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬   |   প্রিন্ট

লোকসান, ঋণ কেলেঙ্কারি ও সুশাসনের অভাব আইএফআইসি ব্যাংকে

লোকসান বৃদ্ধি, খেলাপি ঋণের উচ্চ হার, মূলধন ও প্রভিশন ঘাটতি এবং অতীতের ঋণ কেলেঙ্কারির অভিযোগে চাপে রয়েছে আইএফআইসি ব্যাংক পিএলসি। ব্যাংকটির চেয়ারম্যান মো. মেহমুদ হুসেইনের বিরুদ্ধে বিদেশ সফরে অতিরিক্ত ব্যয়, পরিচালকদের সম্মানী গ্রহণ ও নির্বাহী কর্মকাণ্ডে হস্তক্ষেপের অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অন্যদিকে, একটি প্রতিষ্ঠানের নামে ৫৪৫ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার আসামি ব্যাংকটির বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মনসুর মোস্তফা।

এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের জবাবদিহি, ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা এবং আর্থিক পুনরুদ্ধারের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

চেয়ারম্যান পুনর্নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদন নিয়ে গত জুলাইয়ে প্রকাশিত সংবাদে আইএফআইসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মেহমুদ হুসেইনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের কথা উঠে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাজ্যভিত্তিক সহযোগী প্রতিষ্ঠান আইএফআইসি মানি ট্রান্সফার (ইউকে) লিমিটেডের বোর্ড ও অন্যান্য সভায় অংশ নিতে ২০১১ সাল থেকে ব্যাংকটির প্রায় ৯ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। অথচ ওই সময়ে প্রতিষ্ঠানটি দেশে কোনো লভ্যাংশ পাঠাতে পারেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এ ছাড়া তদন্ত কমিটি ও নিয়োগ-সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়ার জন্য পরিচালকদের সম্মানী এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে অংশগ্রহণের বিপরীতে অর্থ প্রদান নিয়েও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আপত্তির কথা প্রকাশিত হয়। ব্যাংকের দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনায় চেয়ারম্যানের ভূমিকা এবং কয়েকটি নিয়োগের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

এসব অভিযোগ পুনঃতদন্তের জন্য গত ২০ আগস্ট গভর্নরের কাছে আবেদন করেন মেহমুদ হুসেইন। তবে পুনঃতদন্তের বিষয়টি নিষ্পত্তির আগেই গত ১ অক্টোবর ব্যাংকটির ৯৮৬তম পরিচালনা পর্ষদ সভায় তাঁকে আবারও চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয়। এ সিদ্ধান্ত নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মেহমুদ হুসেইনের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

দুদকের মামলার আসামি ব্যাংকের এমডি

আইএফআইসি ব্যাংকের বর্তমান এমডি ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মনসুর মোস্তফার নামও আলোচনায় এসেছে ঋণ কেলেঙ্কারির একটি মামলাকে কেন্দ্র করে।

একটি কাগুজে প্রতিষ্ঠানের নামে ৫৪৫ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন এবং অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, তাঁর ছেলে আহমেদ শায়ান ফজলুর রহমানসহ ২৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক।

মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, স্কাইমার্ক ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের নামে তিন দফায় ঋণ অনুমোদন করা হয়। এর মধ্যে ৫৩৮ কোটি ১৬ লাখ ২৪ হাজার ৪৮২ টাকা বিতরণ বা উত্তোলন করা হয়েছিল। ব্যাংকিং আইন অমান্য করে এক দিনেই সর্বোচ্চ ২৩০ কোটি টাকা উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে।

এ মামলায় সৈয়দ মনসুর মোস্তফার নাম রয়েছে। অভিযোগের সময় তিনি ব্যাংকটির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন। বর্তমানে তিনি এমডি ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বে রয়েছেন। তবে মামলার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া এবং আদালতের চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দোষী হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে সৈয়দ মনসুর মোস্তফাকে ফোন ও ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হলেও তাঁর সাড়া পাওয়া যায়নি।

বাড়ছে লোকসান, ঋণের মান নিয়েও উদ্বেগ

ব্যাংকটির প্রকাশিত আর্থিক তথ্যেও দুর্বলতার চিত্র স্পষ্ট। ২০২৫ সালে সমন্বিত শেয়ারপ্রতি লোকসান দাঁড়ায় ১৩ টাকা ৩২ পয়সা। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সম্পদের মানের অবনতির কারণে ওই বছর নিট লোকসান হয়েছে।

২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেও লোকসান কমেনি, বরং বেড়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুন সময়ে ব্যাংকটির সমন্বিত শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ৮ টাকা ৬৮ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে এ লোকসানের পরিমাণ ছিল ৫ টাকা ৮৭ পয়সা।

একই সঙ্গে জুন শেষে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য কমে যাওয়ার তথ্যও ব্যাংকটির আর্থিক ভিত্তি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় সংস্থান, মূলধন পর্যাপ্ততা এবং অন্যান্য আর্থিক ঝুঁকি নিয়ে ২০২৫ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণীতেও নিরীক্ষকের বিশেষ পর্যবেক্ষণ ছিল।

ব্যাংকটির পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে খেলাপি ঋণের উচ্চ হার। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আইএফআইসি ব্যাংকের মোট ঋণের ৬০ শতাংশের বেশি খেলাপি হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় ঋণ আদায়, নতুন ঋণ বিতরণ এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারি

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, সৈয়দ মনসুর মোস্তফা ডিএমডি থাকাকালে যে আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগে দুদকের মামলার আসামি হয়েছেন, সে বিষয়ে তাঁকে প্রচলিত আইনের আওতায় বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। সে সময় তিনি ব্যাংকের উচ্চ পদে দায়িত্ব পালন করছিলেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এবং তাঁকে পুনর্নির্বাচিত করার বিষয়ে আরিফ হোসেন খান বলেন, পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন নিয়ে কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়ে থাকলে তার দায় বোর্ডের ওপরও বর্তায়। কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তা খতিয়ে দেখার সুযোগ রয়েছে।

তিনি আরও জানান, আইএফআইসি ব্যাংকে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন পর্যবেক্ষক নিয়োগ করা হয়েছে। পর্যবেক্ষক ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম পর্যালোচনা করবেন। প্রয়োজন হলে পরবর্তী সময়ে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

এদিকে সার্বিক বিষয়ে বক্তব্য জানতে আইএফআইসি ব্যাংকের জনসংযোগ বিভাগে যোগাযোগ করা হলে জনসংযোগ কর্মকর্তা এহতেসাম ইমাম এবং ব্র্যান্ডিং, যোগাযোগ ও করপোরেট অ্যাফেয়ার্স বিভাগের প্রধান খন্দকার আনোয়ার এহতেসাম লিখিত প্রশ্ন চান। তাঁরা দ্রুত উত্তর দেওয়ার আশ্বাস দিলেও লিখিত প্রশ্ন পাঠানোর দুই দিন পরও কোনো উত্তর বা ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

লোকসান, খেলাপি ঋণ ও সুশাসনসংক্রান্ত অভিযোগের মধ্যে আইএফআইসি ব্যাংকের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, ঋণ আদায় জোরদার করা এবং পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ না এলে ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ আর্থিক সক্ষমতা এবং আমানতকারীদের আস্থা আরও চাপে পড়তে পারে।

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ৭:১৩ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬

9 News Bd |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

এ বিভাগের আরও খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
শুভ শাহরিয়ার
Contact

-----------------

ফোন : --------------------

E-mail: -----------------------