নিজস্ব প্রতিবেদক | রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬ | প্রিন্ট

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পরও বাংলাদেশের ৯২ শতাংশ পণ্য যুক্তরাজ্যের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। এর মধ্যে তৈরি পোশাকও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। বর্তমানে বাংলাদেশ যুক্তরাজ্যের বাজারে ৯৯ দশমিক ৮ শতাংশ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা ভোগ করছে। এলডিসি থেকে উত্তরণের পরও আরও তিন বছর এই সুবিধা অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার সারাহ কুক।
রোববার (৪ অক্টোবর) রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬-এর দ্বিতীয় দিনে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
সারাহ কুক বলেন, যুক্তরাজ্যের কাছে বাংলাদেশ একটি কৌশলগত ও বিশ্বস্ত অংশীদার। দুই দেশের সম্পর্ক এখন আরও আধুনিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্বে উন্নীত হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান ভূমিকার প্রতিফলন। দুই দেশের মানুষের মধ্যে বিদ্যমান ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ও সম্পর্ক এই অংশীদারিত্বের অন্যতম ভিত্তি।
বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক সম্পর্কের গুরুত্ব তুলে ধরে ব্রিটিশ হাইকমিশনার বলেন, যুক্তরাজ্য বাংলাদেশের অন্যতম বড় বিনিয়োগকারী দেশ। অর্থনীতি ও আর্থিক খাত থেকে শুরু করে পোশাক ও ফ্যাশন, শিক্ষা এবং জ্বালানি—বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্রিটিশ কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরে ভূমিকা রাখছে। এসব বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশে বিপুল কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ যখন এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন যুক্তরাজ্যের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো এ উত্তরণ প্রক্রিয়াকে মসৃণ ও টেকসই করা। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের ‘ডেভেলপিং কান্ট্রিজ ট্রেডিং স্কিম’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই বাণিজ্য সুবিধা বিশ্বের অন্যতম সহজ ও উদার ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত হয়।
বর্তমানে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। যুক্তরাজ্য বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাজার। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর শুল্কমুক্ত সুবিধার বড় অংশ বহাল থাকায় পোশাক রপ্তানিকারকদের জন্য এটি স্বস্তির খবর। তবে একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়তে থাকায় পণ্যের বৈচিত্র্য, উৎপাদন সক্ষমতা, শ্রমমান ও পরিবেশগত মান উন্নয়নের ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
সারাহ কুক দুই দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতার বিষয়টিও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, পারস্পরিক আস্থা ও অভিন্ন লক্ষ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব গড়ে উঠেছে। একটি অবাধ ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে দুই দেশের অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের দায়িত্ব ও ভূমিকা সম্পর্কে যুক্তরাজ্য সচেতন।
তিনি আরও বলেন, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সাইবার নিরাপত্তা এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকির মতো সমসাময়িক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রচলিত নিরাপত্তা কাঠামোর বাইরে গিয়ে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। অর্থনীতি, প্রযুক্তি, পরিবেশ ও নিরাপত্তা এখন পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হওয়ায় এসব ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও যুক্তরাজ্যের অবস্থান তুলে ধরেন ব্রিটিশ হাইকমিশনার। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ ধরে রাখা এবং এর একমাত্র টেকসই সমাধানের জন্য কাজ করে যাওয়ার বিষয়ে যুক্তরাজ্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সেই সমাধান হলো পরিস্থিতি অনুকূল হলে রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে ও মর্যাদাপূর্ণভাবে মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করা।
জলবায়ু পরিবর্তনকে বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের অভিন্ন স্বার্থের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করেন সারাহ কুক। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির বাস্তবতা বাংলাদেশের চেয়ে খুব কম দেশই এত গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, আবহাওয়ার ধরনে পরিবর্তন এবং ঘন ঘন চরম আবহাওয়ার ঘটনা বাংলাদেশের মানুষের জীবনে ইতোমধ্যে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কোনো তাত্ত্বিক বিষয় নয়; দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ এর বাস্তব প্রভাব অনুভব করছে। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও বহন করতে হবে। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের সহযোগিতা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
তিন দিনব্যাপী বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬-এর আয়োজন করেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)। সম্মেলনে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, অর্থনীতি, বাণিজ্য, জলবায়ু পরিবর্তন ও ভূরাজনৈতিক নানা বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে।

Posted ১০:৫৬ এএম | রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬
9 News Bd | s s


