শাহরিয়ার ইসলাম | মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | প্রিন্ট
বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে উদ্বেগ ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে। ছিনতাই, ডাকাতি, খুন, চাঁদাবাজি, বাড়ি দখল, সংঘবদ্ধ হামলা কিংবা সামাজিক বিরোধকে কেন্দ্র করে সহিংসতার খবর নাগরিকদের নিরাপত্তাবোধকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। রাজধানী থেকে মফস্বল—কোথাও কোথাও অপরাধের ধরন ও ভয়াবহতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা, অপরাধ নিয়ন্ত্রণের কৌশল এবং বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে ভাবার দাবি রাখে।
তবে পরিস্থিতি মূল্যায়নে আবেগ কিংবা বিচ্ছিন্ন ঘটনার ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়। অপরাধের সামগ্রিক চিত্র বিশ্লেষণ করতে হবে তথ্যের ভিত্তিতে। কোনো কোনো অপরাধ কমলেও হত্যা, সহিংসতা, নারী ও শিশুর প্রতি নির্যাতন কিংবা সংঘবদ্ধ অপরাধের মতো ঘটনা জননিরাপত্তার ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। তাই শুধু মামলা কমেছে বা বেড়েছে—এই হিসাব দিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন সম্ভব নয়।
একটি হত্যাকাণ্ড, একটি ছিনতাই কিংবা একটি সংঘবদ্ধ দখলদারির ঘটনাও ভুক্তভোগী পরিবার ও সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে। রাষ্ট্রের সাফল্য তাই শুধু অপরাধের পরিসংখ্যানে নয়, নাগরিকের নিরাপত্তাবোধ প্রতিষ্ঠার মধ্যেও প্রতিফলিত হতে হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীতে বাড়ি দখল, চাঁদাবাজি ও সংঘবদ্ধ হামলার অভিযোগে পুলিশের অভিযান এবং অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা অপরাধী চক্রের সক্রিয়তার বিষয়টি সামনে এনেছে। এসব ঘটনায় গ্রেফতার গুরুত্বপূর্ণ হলেও মূল পরিকল্পনাকারী, অর্থের জোগানদাতা এবং নেপথ্যের পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করা আরও জরুরি। অপরাধী গ্রেফতার হলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; তদন্ত, অভিযোগপত্র, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করে অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করা। অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক প্রভাব কিংবা আর্থিক সামর্থ্য যেন তদন্ত ও বিচারের পথে বাধা না হয়। একইভাবে নিরপরাধ কাউকে হয়রানি, বিনা কারণে আটক কিংবা আইনবহির্ভূত বলপ্রয়োগের সুযোগও থাকা উচিত নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি জনগণের আস্থা প্রতিষ্ঠিত হয় পেশাদারত্ব, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মাধ্যমে।
অপরাধ দমনের পাশাপাশি অপরাধের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণগুলোও বিবেচনায় নিতে হবে। বেকারত্ব, মাদক, কিশোর অপরাধ, স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধপ্রবণতাকে উসকে দিতে পারে। এসব মোকাবিলায় পুলিশের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। প্রতিটি এলাকায় কার্যকর অভিযোগ গ্রহণব্যবস্থা, নিয়মিত টহল, দ্রুত তদন্ত এবং ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
বিশেষ করে নারী, শিশু, প্রবীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। থানায় মামলা করতে গিয়ে ভুক্তভোগী যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি। অপরাধের তথ্য প্রকাশে স্বচ্ছতা এবং তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত অবহিতকরণ জনআস্থা বাড়াতে পারে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন কোনো একক অভিযান কিংবা সাময়িক কঠোরতার মাধ্যমে সম্ভব নয়। প্রয়োজন দক্ষ পুলিশ, নিরপেক্ষ তদন্ত, কার্যকর বিচার, অপরাধের রাজনৈতিক ও সামাজিক পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ এবং নাগরিকদের সহযোগিতা। রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক যেন ঘর থেকে বেরিয়ে নিরাপদে ফিরতে পারেন, নিজের সম্পদ ও মর্যাদা নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন—এটাই হওয়া উচিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মূল লক্ষ্য।
সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা আশ্বাস নয়, দৃশ্যমান ফলাফল। অপরাধ কমেছে কি না, তার পাশাপাশি মানুষ কতটা নিরাপদ বোধ করছে, অপরাধীরা বিচারের মুখোমুখি হচ্ছে কি না এবং আইনের শাসন সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হচ্ছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরেই নির্ধারিত হবে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রকৃত অগ্রগতি।
শাহরিয়ার ইসলাম, সাবেক অধ্যাপক (বিসিএস শিক্ষা)
(‘খোলা কলম’ বিভাগে প্রকাশিত লেখাগুলো সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের নিজস্ব মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। এসব লেখার বিষয়বস্তু, বক্তব্য ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণ লেখকের।)
Posted ৬:৫৫ পূর্বাহ্ণ | মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
9 News Bd | s s