নাইমা জান্নাত | রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | প্রিন্ট
শিশু নিখোঁজ—একটি পরিবারের জন্য এর চেয়ে ভয়াবহ দুঃসংবাদ খুব কমই আছে। ঘরের উঠান, স্কুলের পথ, বাজার কিংবা কোনো বিনোদনকেন্দ্র থেকে একটি শিশু হঠাৎ হারিয়ে গেলে মুহূর্তেই নেমে আসে আতঙ্ক। সন্তানের সন্ধানে বাবা-মায়ের ছোটাছুটি, থানায় যোগাযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ছড়িয়ে দেওয়া—সবকিছুর মধ্যেও সময় যেন থেমে থাকে না। প্রতিটি মিনিট তখন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নিখোঁজ হওয়ার পর যত দ্রুত শিশুটির সন্ধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যায়, নিরাপদে ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনাও তত বাড়ে।
বাংলাদেশে শিশু নিখোঁজের ঘটনা নিয়ে সামাজিক উদ্বেগ দীর্ঘদিনের। তবে প্রতিটি নিখোঁজের পেছনে একই কারণ থাকে না। কেউ পরিবারের সঙ্গে অভিমান করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়, কেউ পথ হারায়, আবার কেউ প্রতারণা, প্রলোভন, অপহরণ বা অপরাধের শিকার হতে পারে। তাই কোনো শিশুকে নিখোঁজ হওয়ার পর শুধু ‘হারিয়ে গেছে’ বলে ধরে নেওয়া বিপজ্জনক। বিষয়টিকে শুরু থেকেই গুরুত্ব দিয়ে সম্ভাব্য সব কারণ বিবেচনায় নিয়ে অনুসন্ধান করা জরুরি।
শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম কাজ হলো দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো। অনেক পরিবার সামাজিক লজ্জা, ভয় বা নানা কারণে থানায় যেতে দেরি করে। এ প্রবণতা বদলাতে হবে। একই সঙ্গে শিশুর সাম্প্রতিক ছবি, পোশাকের বিবরণ, বয়স, শারীরিক বৈশিষ্ট্য, শেষ কোথায় দেখা গেছে, কার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল—এসব তথ্য দ্রুত সংগ্রহ করে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে দিতে হবে। প্রযুক্তির এই সময়ে আশপাশের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ, মোবাইল ফোনের তথ্য এবং ডিজিটাল যোগাযোগও অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হতে পারে।
তবে শুধু নিখোঁজ হওয়ার পর ব্যবস্থা নিলেই হবে না; প্রতিরোধ ব্যবস্থাও শক্তিশালী করতে হবে। স্কুলে শিশুদের বয়স উপযোগী নিরাপত্তা শিক্ষা দেওয়া জরুরি। অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে কোথাও না যাওয়া, কারও দেওয়া উপহার বা খাবার নেওয়ার আগে সতর্ক থাকা, বিপদে পড়লে পরিচিত ও বিশ্বস্ত ব্যক্তির সাহায্য চাওয়া—এসব বিষয়ে শিশুদের নিয়মিত শেখাতে হবে। একই সঙ্গে ‘অপরিচিত’ ব্যক্তির পাশাপাশি পরিচিত কেউ অস্বস্তিকর আচরণ করলে কী করতে হবে, সেটিও শিশুদের বোঝানো প্রয়োজন।
অভিভাবকদেরও দায়িত্ব কম নয়। শিশুর দৈনন্দিন চলাফেরা, বন্ধু, স্কুলে যাতায়াত এবং অনলাইন যোগাযোগ সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন। তবে এই নজরদারি যেন অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণে পরিণত না হয়। শিশুর সঙ্গে এমন সম্পর্ক তৈরি করতে হবে, যাতে কোনো বিপদে পড়লে সে ভয় না পেয়ে বাবা-মাকে জানাতে পারে।
শিশু সুরক্ষায় স্থানীয় পর্যায়েও কার্যকর ব্যবস্থা দরকার। স্কুল, স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, জনপ্রতিনিধি, পরিবহনব্যবস্থা এবং নাগরিক সংগঠনগুলোর মধ্যে সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে কার্যকর নজরদারি, শিশু-বান্ধব অভিযোগ গ্রহণ ব্যবস্থা এবং নিখোঁজ শিশুর তথ্য দ্রুত বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে আদান-প্রদানের ব্যবস্থা থাকলে অনুসন্ধান আরও কার্যকর হতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে শিশুর ছবি বা ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা জরুরি। যাচাই না করে কোনো গুজব ছড়ানো, সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে জনসমক্ষে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা কিংবা শিশুর সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ করা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—একটি শিশু নিখোঁজ হওয়াকে কোনো পরিবারের একার সমস্যা হিসেবে দেখা যাবে না। এটি সমাজের নিরাপত্তা ও মানবিকতার প্রশ্ন। একটি শিশু নিরাপদে ঘরে ফিরবে—এ দায়িত্ব শুধু তার বাবা-মায়ের নয়; পরিবার, সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন ও রাষ্ট্র—সবার।
শিশু নিখোঁজের ঘটনা শূন্যে নামিয়ে আনা হয়তো কঠিন। কিন্তু দ্রুত প্রতিক্রিয়া, প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার, সচেতনতা, নিরাপদ পরিবেশ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। আতঙ্ক ছড়িয়ে নয়, দায়িত্বশীলতা ও কার্যকর ব্যবস্থার মাধ্যমেই শিশুদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হবে।
লেখক: অধিকার কর্মী
Posted ২:৪৬ অপরাহ্ণ | রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
9 News Bd | s s