নিজস্ব প্রতিবেদক | মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | প্রিন্ট

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বেড়েছে বেকারিতে তৈরি খোলা পাউরুটি বা বনরুটি ও কেকের দাম। ঢাকার বাইরেও কিছু অঞ্চলে এসব পণ্যের দাম বাড়ানো হয়েছে। কোথাও আবার দাম অপরিবর্তিত রেখে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে রুটি ও কেকের ওজন। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্যের মধ্যে নতুন করে বাড়তি ব্যয়ের মুখে পড়েছেন নিম্নবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষ।
বেকারি মালিকদের দাবি, গত দেড় থেকে দুই বছরে ময়দা, চিনি, ডালডা, সয়াবিন তেল, গ্যাসসহ প্রায় সব ধরনের উৎপাদন উপকরণের দাম বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয়। এ পরিস্থিতিতে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে বাধ্য হয়েই বেকারি পণ্যের দাম ও ওজন পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্টে দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ০২ শতাংশ। একই সময়ে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ। মাছ, মাংস, সবজি, ভোজ্যতেল, চিনি থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা পণ্যের দাম আগে থেকেই বাড়তি। এর মধ্যে রুটি ও কেকের দাম বাড়ায় সীমিত আয়ের মানুষের দৈনন্দিন খরচ আরও বেড়েছে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, নতুন দামে বিক্রি হচ্ছে বনরুটি, কেকসহ বিভিন্ন বেকারি পণ্য। মোহাম্মদপুর, মিরপুর, তেজগাঁও, কারওয়ান বাজার, মগবাজার ও খিলগাঁও এলাকায় খুচরা পর্যায়ে এসব পণ্যের দাম বাড়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
রিকশাচালক আলমগীর বলেন, দিনের পরিশ্রমের মধ্যে দুই দফা ভাড়া মারার পর একটি রুটি ও এক কাপ চা খেলে শরীরে শক্তি পাওয়া যায়। কিন্তু রুটির দাম বাড়ায় প্রতিদিনের খরচও বেড়ে গেছে।
কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি ও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে গত শনিবার থেকে বেকারি পণ্যের নতুন দাম কার্যকর করেছে বাংলাদেশ ব্রেড বিস্কুট ও কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতি। সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রুটি, বিস্কুটসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম ও ওজন সমন্বয় করা হয়েছে। সামগ্রিকভাবে কিছু পণ্যের দাম সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, হাতে তৈরি সাধারণ বেকারি বিস্কুটের দামও কেজিতে গড়ে ২০ টাকা বেড়েছে। আগে যে বিস্কুট ১৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতো, এখন তা ১৫০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে।
বনরুটি ও মাফিন কেকের ক্ষেত্রে কোথাও দাম বাড়ানোর পাশাপাশি ওজন কমানো হয়েছে। ৪০ গ্রাম ওজনের কিছু বনরুটি ও মাফিন কেকের দাম অপরিবর্তিত রেখে ওজন কমিয়ে ৩৫ গ্রাম করা হয়েছে। আবার ১০ বা ১২ টাকা দামের কোনো কোনো বনরুটির দাম বাড়িয়ে ১৫ টাকা করা হয়েছে। তবে এসব ক্ষেত্রে রুটির আকার কিছুটা বড় করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
দাম বাড়ানোর দাবিতে গত বুধবার ও বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিভিন্ন বেকারি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখা হয়েছিল। দুই দিন উৎপাদন বন্ধ থাকার পর শনিবার সকাল থেকে নতুন দামে বাজারে পণ্য সরবরাহ শুরু করে বেকারিগুলো।
তবে দেশের সব অঞ্চলে একই সময়ে দাম বাড়েনি। খুলনা, চট্টগ্রাম, সাভার ও রাজশাহীতে রোববার পর্যন্ত আগের দামেই বনরুটি ও কেক বিক্রি হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
রুটি ও কেকের দাম বাড়ায় চায়ের দোকানিরাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের আশঙ্কা, বাড়তি দামের কারণে ক্রেতারা এসব পণ্য কম কিনলে বিক্রি কমে যেতে পারে।
মোহাম্মদপুরের আওরঙ্গজেব সড়কের চা বিক্রেতা জব্বার শেখ বলেন, গত এক মাসে চা পাতার দাম কেজিতে প্রায় ৫০ টাকা বেড়েছে। চিনির দামও কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা বেড়েছে। এর মধ্যে রুটি ও কেকের দাম বাড়লেও চায়ের দাম বাড়াতে পারছেন না তাঁরা। ফলে বিক্রি কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্রেড বিস্কুট ও কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতির হিসাবে, দেশে ছোট ও মাঝারি আকারের বেকারির সংখ্যা প্রায় ৭ হাজার। এর মধ্যে ঢাকাতেই রয়েছে ৭০০টির বেশি।
বেকারি পণ্যের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল ময়দা, ভোজ্যতেল, ডালডা ও চিনি। পাশাপাশি উৎপাদন প্রক্রিয়ায় গ্যাসের প্রয়োজন হয়। ব্যবসায়ীদের দাবি, গত ছয় মাসে এসব উপকরণের প্রায় সবগুলোর দাম বেড়েছে।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, ছয় মাস আগের তুলনায় খুচরা বাজারে প্রতি কেজি খোলা ময়দার দাম প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে খোলা সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে প্রায় ৫ শতাংশ এবং চিনির দাম বেড়েছে গড়ে ১১ শতাংশ।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, কাঁচামালের পাশাপাশি শ্রমিকের মজুরি, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। সব মিলিয়ে উৎপাদন খরচ আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় বেকারি পণ্যের দাম সমন্বয় করা ছাড়া তাঁদের সামনে আর কোনো পথ ছিল না।
তবে দাম বাড়ার ফলে সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি হচ্ছে স্বল্প আয়ের মানুষের ওপর। চা-বিস্কুট কিংবা একটি বনরুটি অনেক শ্রমজীবী মানুষের জন্য দ্রুত ও তুলনামূলক সস্তা খাবারের বিকল্প। সেই খাবারের দাম বাড়ায় তাঁদের দৈনন্দিন ব্যয়ের হিসাবেও নতুন চাপ যোগ হয়েছে।

Posted ৬:০০ এএম | মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
9 News Bd | s s


