আন্তর্জাতিক ডেস্ক | শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | প্রিন্ট
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত নতুন করে জটিল রূপ নিচ্ছে ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি বাহিনীর অগ্রগতিতে। গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর লোহিত সাগরের উপকূল ধরে দক্ষিণে এগিয়ে যাচ্ছে তারা। একই সঙ্গে কৌশলগত হানিশ দ্বীপপুঞ্জের দিকেও হুথিদের অগ্রসর হওয়ার দাবি করেছে ইয়েমেন সরকারের সামরিক সূত্র।
হুথিদের এই অগ্রগতিতে লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তের গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালি ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ বা সেখানে প্রভাব বিস্তার করতে পারলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়তে পারে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি ও নিরাপত্তা।
মোখা দখলের পর দক্ষিণে অগ্রসর
১০ সেপ্টেম্বর ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর হুথি বাহিনী লোহিত সাগরের উপকূল ধরে আরও দক্ষিণে অগ্রসর হয়েছে। ইয়েমেন সরকারের সামরিক সূত্রের দাবি, হুথিরা কৌশলগত হানিশ দ্বীপপুঞ্জের কাছাকাছিও পৌঁছে গেছে।
মোখা লোহিত সাগরের তীরে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর। বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছাকাছি হওয়ায় সামরিক ও বাণিজ্যিক—দুই দিক থেকেই এর কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। ফলে শহরটি হুথিদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার ঘটনা ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের পাশাপাশি আঞ্চলিক নৌনিরাপত্তার ক্ষেত্রেও নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
বাব আল-মান্দেব প্রণালি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এর মাধ্যমে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে ইউরোপ ও এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের যোগাযোগ তৈরি হয়। ফলে এই এলাকায় সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে জাহাজ চলাচল, পণ্য পরিবহন ও জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
সৌদি আরবের জন্য বাড়ছে উদ্বেগ
হুথিদের অগ্রগতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে সৌদি আরবের ওপর। বিশেষ করে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সীমিত হয়ে পড়লে সৌদি আরবের জন্য লোহিত সাগরের সমুদ্রপথের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।
সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম বড় তেল রপ্তানিকারক দেশ। দেশটির তেল সরবরাহের একটি অংশ বিকল্প সমুদ্রপথে নেওয়ার সুযোগ থাকলেও লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা বাড়লে পরিবহন ব্যয়, বীমা খরচ এবং সরবরাহের ঝুঁকি একসঙ্গে বাড়তে পারে।
হুথিরা যদি বাব আল-মান্দেবের ওপর কার্যকর প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তাহলে সৌদি আরবের পাশাপাশি অন্যান্য উপসাগরীয় দেশও নতুন নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়বে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে দীর্ঘতর বিকল্প পথে ঘুরিয়ে নিতে হলে সময় ও ব্যয় দুটিই বাড়বে।
হরমুজের পর বাব আল-মান্দেব
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকটে হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি বাব আল-মান্দেবও এখন গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত হচ্ছে। পারস্য উপসাগর থেকে তেল ও গ্যাস পরিবহনের ক্ষেত্রে হরমুজের গুরুত্ব যেমন অত্যন্ত বেশি, তেমনি ইউরোপ-এশিয়া বাণিজ্যপথে বাব আল-মান্দেবের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
ফলে একটি প্রণালিতে সংকট তৈরি হওয়ার পর অন্য গুরুত্বপূর্ণ নৌপথেও যদি সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ে, তাহলে বিশ্ববাজারে তার প্রভাব বহুগুণে বেড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে নতুন মাত্রা
হুথিদের অগ্রগতি এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান যুদ্ধ ঘিরে উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা তীব্র। এর আগে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তার সঙ্গে এখন লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেবের ঝুঁকিও যুক্ত হচ্ছে।
হুথিরা দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে আঞ্চলিক সংঘাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ফলে ইয়েমেন উপকূলে তাদের সামরিক অগ্রগতিকে শুধু স্থানীয় যুদ্ধের অংশ হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকেরা; বরং এর সঙ্গে ইরানকেন্দ্রিক বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের যোগসূত্রও দেখা হচ্ছে।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরান যুদ্ধ নভেম্বরের মধ্যবর্তী মার্কিন নির্বাচনের পর শেষ হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ইয়েমেনে হুথিদের নতুন অগ্রগতি যুদ্ধের সমাপ্তির প্রচেষ্টাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
বাব আল-মান্দেবের নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হলে এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি বাড়লে তেল পরিবহনের খরচ ও সময় বাড়বে। একই সঙ্গে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কায় বাজারে তেলের দামও বাড়তে পারে।
এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হতে পারে। বিশ্ব অর্থনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
Posted ১:৩৮ অপরাহ্ণ | শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
9 News Bd | s s