নিজস্ব প্রতিবেদক | বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬ | প্রিন্ট

বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে দুই দেশের ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা আরও জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে দি ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই)।
বুধবার (২৬ আগস্ট) ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক। এ সময় দুই দেশের বেসরকারি খাতের মধ্যে যোগাযোগ ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তিনি।
বৈঠকে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে মো. ফজলুল হক চীনা উদ্যোক্তাদের বাংলাদেশে আরও বেশি বিনিয়োগের আহ্বান জানান। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও খুলনাসহ দেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য চীনা বিনিয়োগকারীদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
চীনা উদ্যোক্তারা বাংলাদেশে ব্যবসা ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে আগ্রহী হলে এফবিসিসিআইয়ের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার আশ্বাসও দেন প্রশাসক। তিনি বলেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চীনা ব্যবসায়ীদের জন্য সহযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরিতে বেসরকারি খাতের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে।
বৈঠকে মো. ফজলুল হক বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়াতে এফবিসিসিআই, চায়না কাউন্সিল ফর দ্য প্রমোশন অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড এবং চায়নিজ এন্টারপ্রাইজেস অ্যাসোসিয়েশন ইন বাংলাদেশের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ ও সমন্বিত উদ্যোগ আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। নিয়মিত ব্যবসায়ী প্রতিনিধি বিনিময়, যৌথ কর্মসূচি এবং বিনিয়োগসংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্ক আরও কার্যকর করা সম্ভব বলে তিনি মত দেন।
বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের চীনের বাজারে প্রবেশ ও ব্যবসায়িক যোগাযোগ আরও সহজ করতে ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়টিও বৈঠকে তুলে ধরেন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক। তাঁর মতে, দুই দেশের ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের নিয়মিত যোগাযোগ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই ব্যবসায়িক সফর ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান জটিলতা কমানো প্রয়োজন।
এ সময় চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিতে চীনা দূতাবাস আন্তরিকভাবে কাজ করতে প্রস্তুত। দুই দেশের বেসরকারি খাতের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগের সম্ভাবনাময় কয়েকটি খাতের কথাও তুলে ধরেন ইয়াও ওয়েন। এর মধ্যে বৈদ্যুতিক যান, ফল ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং পর্যটন খাত উল্লেখযোগ্য। এসব খাতে দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে বলে তিনি জানান।
বৈঠকে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ বৃদ্ধির পাশাপাশি বাংলাদেশের পণ্য চীনের বাজারে আরও বেশি রপ্তানির বিষয়েও আলোচনা হয়। বিশেষ করে কৃষিপণ্য ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যসহ সম্ভাবনাময় বাংলাদেশি পণ্যের জন্য চীনের বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে গত এক দশকে বাণিজ্যিক সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তৃত হলেও দুই দেশের বাণিজ্যে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ চীনে প্রায় ৬৯৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। বিপরীতে একই সময়ে চীন থেকে বাংলাদেশ আমদানি করেছে প্রায় ১৮ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। অর্থাৎ চীন থেকে বাংলাদেশের আমদানি রপ্তানির তুলনায় প্রায় ২৬ গুণ বেশি।
এই বিপুল বাণিজ্য ঘাটতি কমানো বাংলাদেশের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এ ক্ষেত্রে শুধু চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ানো নয়, বরং চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণ করে বাংলাদেশে উৎপাদন বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী নেতারা। বাংলাদেশে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো শিল্প স্থাপন করলে স্থানীয় উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ার পাশাপাশি চীনের বাজারে বাংলাদেশ থেকে পণ্য রপ্তানির সুযোগও তৈরি হতে পারে।
বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। চীনা উদ্যোক্তারা বাংলাদেশে কারখানা স্থাপন করে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য পণ্য উৎপাদন করলে বাংলাদেশ বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে। একই সঙ্গে প্রযুক্তি, দক্ষতা ও ব্যবস্থাপনা জ্ঞান স্থানান্তরের সুযোগও বাড়বে।
বাংলাদেশের জন্য চীনের বাজারও গুরুত্বপূর্ণ। বিপুল জনসংখ্যার দেশ চীনে খাদ্যপণ্য, কৃষিপণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, তৈরি পোশাক এবং বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তবে এসব সুযোগ কাজে লাগাতে পণ্যের মান, উৎপাদন সক্ষমতা, বাজারসংযোগ এবং বাণিজ্যিক যোগাযোগ আরও উন্নত করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে চীনের জন্যও বাংলাদেশ ক্রমবর্ধমান সম্ভাবনাময় বিনিয়োগ গন্তব্য। বৃহৎ ভোক্তা বাজার, তুলনামূলক কম উৎপাদন ব্যয়, আঞ্চলিক বাজারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য সম্ভাবনা তৈরি করছে। ফলে দুই দেশের ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ বাড়ানো গেলে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।
এফবিসিসিআইয়ের মহাসচিব মো. আলমগীর এবং ঢাকায় অবস্থিত চীনা দূতাবাসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্য সম্পর্ক এখন শুধু পণ্য আমদানি-রপ্তানির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই। বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন, প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক যান, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পর্যটনসহ বহুমুখী খাতে সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন। প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ জোরদার ও ব্যবসায়ীদের সরাসরি যোগাযোগ বাড়াতে পারলে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও টেকসই হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Posted ১২:৩৮ পিএম | বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬
9 News Bd | s s


