নিজস্ব প্রতিবেদক | বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬ | প্রিন্ট

চলতি বছর আর মাঠে গড়াচ্ছে না বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) আসর। সাম্প্রতিক দুই আসরের নানা অনিয়ম, আর্থিক জটিলতা ও লোকসানের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে তাড়াহুড়ো করে টুর্নামেন্ট আয়োজন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। বরং পর্যাপ্ত সময় নিয়ে বিপিএলের কাঠামো ও আয়োজন প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনে আগামী বছর নতুনভাবে টুর্নামেন্ট ফেরানোর পরিকল্পনা করছে বোর্ড। বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
বিপিএল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অনিশ্চয়তা চলছিল। গত ৩০ জুলাই বিসিবি সভাপতি জানিয়েছিলেন, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ছাড়া শুধু নিয়ম রক্ষার জন্য পরবর্তী আসর আয়োজন করতে চান না তারা। তখন থেকেই চলতি বছরের বিপিএল নিয়ে সংশয় তৈরি হয়। এবার সেই সংশয় দূর করে বোর্ডের অবস্থান স্পষ্ট করলেন তামিম। তিনি জানিয়েছেন, ‘এ বছর বিপিএল হচ্ছে না’ এবং টুর্নামেন্টের জন্য একটি নতুন ফর্মুলা নিয়ে কাজ চলছে।
বিসিবির এই সিদ্ধান্তের পেছনে অন্যতম বড় কারণ গত দুই আসরের অভিজ্ঞতা। ফ্র্যাঞ্চাইজি-ভিত্তিক এই টুর্নামেন্টে খেলাধুলার চেয়ে নানা সময় পারিশ্রমিক, আর্থিক দায়বদ্ধতা, ফ্র্যাঞ্চাইজির নিয়ম না মানা এবং ব্যবস্থাপনা নিয়ে নেতিবাচক আলোচনা বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। বিসিবি সভাপতির ভাষ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে বিপিএল আয়োজন করতে গিয়ে বোর্ডের প্রায় ৪০ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। ফলে একই ধরনের কাঠামোয় আবার টুর্নামেন্ট আয়োজন করলে সেই সমস্যা আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছে বোর্ড।
তামিম ইকবালের বক্তব্যে বিপিএলের ভাবমূর্তি নিয়েও উদ্বেগের বিষয়টি উঠে এসেছে। তাঁর মতে, একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি প্রতিযোগিতা হিসেবে বিপিএল শুধু দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের আসর নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ক্রিকেটেরও প্রতিনিধিত্ব করে। তাই টুর্নামেন্টের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত ম্যাচ, খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা। অর্থসংক্রান্ত বিরোধ বা ব্যবস্থাপনার নেতিবাচক খবর দিয়ে টুর্নামেন্টের পরিচিতি তৈরি হোক—এমনটা তিনি চান না।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিপিএলকে ঘিরে একাধিক বিতর্কও হয়েছে। বিশেষ করে ফ্র্যাঞ্চাইজিদের আর্থিক দায়বদ্ধতা এবং বিভিন্ন নিয়মকানুন যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না হওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক ও অন্যান্য আর্থিক বিষয়ও বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে। ফলে নতুন আসর শুরুর আগে ফ্র্যাঞ্চাইজি বাছাই, আর্থিক সক্ষমতা যাচাই, চুক্তির শর্ত এবং দায়বদ্ধতার বিষয়গুলো আরও কঠোরভাবে নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
এবারের সিদ্ধান্তের ফলে বিসিবি মূলত একটি পূর্ণাঙ্গ পুনর্গঠনের সময় পাচ্ছে। বোর্ডের পরিকল্পনা হচ্ছে, বিপিএলকে এমন একটি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা, যেখানে ফ্র্যাঞ্চাইজি, খেলোয়াড়, সম্প্রচারক, পৃষ্ঠপোষক এবং আয়োজকদের দায়িত্ব স্পষ্ট থাকবে। একই সঙ্গে আর্থিক স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতার বিষয়েও কঠোর নিয়ম চালু করার সুযোগ তৈরি হবে। নতুন ফর্মুলার বিস্তারিত এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে বোর্ডের বক্তব্যে স্পষ্ট, পুরোনো কাঠামোতে ফিরে যাওয়ার বদলে বড় পরিবর্তনের দিকেই এগোচ্ছে বিসিবি।
বিপিএলের নাম ও কাঠামো নিয়েও নতুন করে আলোচনা রয়েছে। বোর্ডের একটি অংশ মনে করছে, সাম্প্রতিক বিতর্কের কারণে ‘বিপিএল’ নামটির সঙ্গে নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে। তাই প্রয়োজনে নতুন নামে ও নতুন কাঠামোয় একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি টি-টোয়েন্টি প্রতিযোগিতা আয়োজনের বিষয়টিও বিবেচনায় থাকতে পারে। যদিও এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
চলতি বছর বিপিএল না হওয়ায় ক্রিকেটারদের ওপরও এর প্রভাব পড়বে। দেশের অনেক ক্রিকেটারের জন্য এই প্রতিযোগিতা জাতীয় দলের বাইরে নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণের অন্যতম বড় মঞ্চ। বিশেষ করে তরুণ ক্রিকেটারদের জন্য বিপিএল গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা ও প্রতিযোগিতার সুযোগ তৈরি করে। তবে বিসিবির যুক্তি হলো, মানহীন বা অগোছালো একটি আসর আয়োজনের চেয়ে এক বছর বিরতি নিয়ে আরও শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য প্রতিযোগিতা আয়োজন করা দীর্ঘমেয়াদে বেশি লাভজনক হতে পারে।
বাংলাদেশের ক্রিকেটের বাণিজ্যিক দিক থেকেও বিপিএল গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রচার স্বত্ব, পৃষ্ঠপোষকতা, টিকিট বিক্রি এবং ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর বিনিয়োগের মাধ্যমে টুর্নামেন্টটি বড় একটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি করে। কিন্তু বারবার বিতর্ক তৈরি হলে দর্শক ও বাণিজ্যিক অংশীদারদের আস্থা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই নতুন আয়োজনের আগে ব্যবসায়িক কাঠামো শক্তিশালী করার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে বিসিবিকে।
এর আগে ২০২৬ সালের বিপিএল আয়োজনের সময়ও নানা জটিলতা দেখা দিয়েছিল। খেলোয়াড়দের বয়কটের কারণে ম্যাচ স্থগিত ও সূচিতে পরিবর্তন করতে হয়েছিল। পারিশ্রমিক ও বোর্ডের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা নিয়েও তখন নানা আলোচনা হয়। এসব অভিজ্ঞতা নতুন করে বিপিএল আয়োজনের ক্ষেত্রে বোর্ডকে আরও সতর্ক করেছে।
এখন বিসিবির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে আগামী বছরের জন্য একটি কার্যকর কাঠামো তৈরি করা। শুধু নতুন নিয়ম ঘোষণা করলেই হবে না; সেই নিয়ম বাস্তবায়নের জন্য শক্তিশালী প্রশাসনিক ব্যবস্থা, আর্থিক নজরদারি এবং চুক্তিভিত্তিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে। ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর আর্থিক সক্ষমতা যাচাই থেকে শুরু করে খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে হবে।
বিসিবি সভাপতির বক্তব্য অনুযায়ী, তাড়াহুড়ো করে ‘নামেমাত্র’ একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্ট আয়োজনের চেয়ে সময় নিয়ে নতুনভাবে পরিকল্পনা করাই এখন অগ্রাধিকার। লক্ষ্য হচ্ছে এমন একটি বিপিএল আয়োজন করা, যেখানে মাঠের ক্রিকেটই হবে প্রধান আকর্ষণ এবং টুর্নামেন্টের বাণিজ্যিক ও সাংগঠনিক দিকগুলোও আন্তর্জাতিক মানের হবে।
ফলে এক বছরের জন্য বিপিএলের বিরতি আপাতদৃষ্টিতে দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য হতাশার খবর হলেও বিসিবি এটিকে পুনর্গঠনের সুযোগ হিসেবে দেখছে। আগামী বছর নতুন কাঠামো, নতুন নিয়ম এবং আরও শক্তিশালী ব্যবস্থাপনায় বিপিএল ফেরানোর লক্ষ্য নিয়েই এগোচ্ছে বোর্ড। এখন দেখার বিষয়, এই বিরতির সময়টুকু কাজে লাগিয়ে বিসিবি কতটা কার্যকর সংস্কার করতে পারে এবং নতুন বিপিএল শেষ পর্যন্ত দেশের ক্রিকেটের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে কি না।

Posted ১২:৪০ পিএম | বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬
9 News Bd | s s


