নিজস্ব প্রতিবেদক | মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬ | প্রিন্ট
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজশাহীতে দুই আন্দোলনকারীকে হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটনসহ ৩৮ আসামির বিরুদ্ধে আনা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। একই সঙ্গে ৩৪ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। বাকি চারজনকে কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) ট্রাইব্যুনাল এ আদেশ দেন। এর আগে গত ৩০ জুলাই এই ৩৮ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেছিল রাষ্ট্রপক্ষ। অভিযোগ আমলে নেওয়ার মধ্য দিয়ে মামলাটি বিচারপ্রক্রিয়ার আরও এক ধাপ এগোল। পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করা হয়েছে।
মামলার আসামিদের মধ্যে খায়রুজ্জামান লিটন ছাড়াও রয়েছেন রাজশাহী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মো. আসাদুজ্জামান আসাদ, রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার, রাজশাহী মহানগর পুলিশের সাবেক কমিশনার বিপ্লব বিজয় তালুকদার, বোয়ালিয়া থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হুমায়ুন কবিরসহ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী।
ট্রাইব্যুনালের আদেশ অনুযায়ী, পলাতক ৩৪ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। আর চারজন আসামিকে কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করার জন্য উৎপাদন পরোয়ানা দেওয়া হয়েছে। তাঁরা হলেন সাবেক সংসদ সদস্য মো. আসাদুজ্জামান আসাদ, ডাবলু সরকার, জহিরুল ইসলাম রুবেল ও মোহাইমিনুল ইসলাম মানিক।
রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজশাহীতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। ওই দিন দুপুরে নগরের বোয়ালিয়া থানার শেখেরচক এলাকার স্বচ্ছ টাওয়ারের বিপরীতে লবঙ্গ রেস্টুরেন্টের সামনে আন্দোলনকারী রায়হান আলীকে গুলি করে হত্যার অভিযোগ করা হয়েছে। একই সময়ে শাহ মখদুম কলেজের সামনে আনজুম সাকিব নিহত হন। এসব ঘটনায় সালমান ওরফে শিমুলসহ আরও অনেকে গুরুতর আহত হন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, শেখেরচক স্বচ্ছ টাওয়ার, শাহ মখদুম কলেজ, পদ্মা নদীর বেড়িবাঁধ, আলুপট্টি মোড় ও আশপাশের এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা, গুলিবর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা ছিল না। এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতা ছিল বলে তদন্তে তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং সেগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধের আওতায় পড়ে বলে রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করেছে।
এর আগে দীর্ঘ তদন্ত শেষে গত ৩০ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ৩৮ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়। তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদন ও সংগৃহীত তথ্য-প্রমাণ পর্যালোচনার পর রাষ্ট্রপক্ষ এই অভিযোগ দাখিল করে। অভিযোগে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজশাহীতে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়।
প্রসিকিউশনের অভিযোগে বলা হয়েছে, ৫ আগস্টের ঘটনাগুলোতে শুধু দুই আন্দোলনকারী নিহতই হননি, আরও বহু মানুষ আহত হয়েছেন। বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত হামলা ও গুলিবর্ষণের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের দমন করার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ এখনো বিচারাধীন এবং আদালতে সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আসামিদের দায় নির্ধারিত হবে।
৩৮ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেওয়ার ফলে এখন মামলাটির পরবর্তী ধাপ হবে আসামিদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা এবং বিচারিক কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া। পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার করা এবং গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের আদালতের সামনে হাজির করাই তাৎক্ষণিকভাবে রাষ্ট্রপক্ষের অন্যতম লক্ষ্য। একই সঙ্গে মামলায় উপস্থাপন করা হবে নথি, সাক্ষ্য ও অন্যান্য প্রমাণ।
রাজশাহীর এই মামলাটি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা হিসেবে দেখা হচ্ছে। রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন জেলায় আন্দোলন ঘিরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতার দায় নির্ধারণে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একাধিক মামলা চলমান রয়েছে। রাজশাহীর মামলায় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, সাবেক জনপ্রতিনিধি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তাদের নাম থাকায় এর বিচারিক অগ্রগতির দিকে নজর রয়েছে।
মামলার অভিযোগে যাদের নাম রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এমন কোনো সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। ট্রাইব্যুনালে বিচার শেষে সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই প্রত্যেক আসামির দায় বা নির্দোষিতা নির্ধারিত হবে। আগামী ১৭ সেপ্টেম্বরের শুনানিতে মামলাটির পরবর্তী কার্যক্রম নিয়ে ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত জানা যাবে।
Posted ১১:০৭ পূর্বাহ্ণ | মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬
9 News Bd | s s