শিরোনাম >>
শিরোনাম >>

ইরান এখন আক্রমণাত্মক অবস্থানে, অগ্রিম হামলার প্রস্তুতি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক   |   মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬   |   প্রিন্ট

ইরান এখন আক্রমণাত্মক অবস্থানে, অগ্রিম হামলার প্রস্তুতি

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে কূটনৈতিক সমাধান না হলে সামরিক অভিযান আরও জোরদার করার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। দেশটির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, আলোচনা ব্যর্থ হলে ইরান ‘পুরোপুরি আক্রমণাত্মক’ সামরিক অবস্থানে যাবে। প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ ভাঙতে ‘সময়মতো ও নির্ভুল’ হামলা চালানোর জন্যও প্রস্তুত রয়েছে তেহরান।

সোমবার ওই কর্মকর্তা বলেন, কূটনৈতিক পথে সংকটের সমাধান না হলে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া ইরানের সামনে আর কোনো পথ থাকবে না। এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, জুনে হওয়া অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা তার নেই।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর দুই দেশের মধ্যে সংঘাত শুরু হয়। যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে ১৭ জুন একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ওই সমঝোতা অনুযায়ী, ৬০ দিনের মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে একটি স্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছানোর কথা ছিল।

সোমবার সেই সময়সীমা শেষ হলেও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয়ে দুই পক্ষের মতপার্থক্য এখনো কাটেনি। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বিরোধ তৈরি হয়েছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করা হতো। ফলে এই নৌপথে কোনো ধরনের সামরিক সংঘাত বা জাহাজ চলাচলে বাধা তৈরি হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে।

ইরানের দাবি, জুনের সমঝোতা স্মারকের একটি ধারা অনুযায়ী হরমুজ প্রণালী পরিচালনার অধিকার তাদের রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেছে। বিরোধের মধ্যেই হরমুজ দিয়ে চলাচলকারী কয়েকটি জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইরান। তেহরানের দাবি, এসব জাহাজ অনুমোদনহীন পথে চলাচল করছিল।

এর আগে জুলাইয়ের শুরুতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা করেন, জুনে স্বাক্ষরিত চুক্তি আর কার্যকর নেই। ফলে যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়ে যায়।

ইরানের ওই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসার আগে ওয়াশিংটনকে সমঝোতা স্মারকের সব শর্ত পূরণ করতে হবে। ইরানের দৃষ্টিতে, কেবল আলোচনার প্রতিশ্রুতি নয়, যুক্তরাষ্ট্রের বাস্তব পদক্ষেপই হবে পরবর্তী আলোচনার ভিত্তি।

তবে সামরিক হুমকির পাশাপাশি কূটনৈতিক যোগাযোগের সম্ভাবনাও পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। বিভিন্ন মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসির সঙ্গে গোপনে যোগাযোগের চেষ্টা করেছে।

অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সাবেক মার্কিন গোয়েন্দাপ্রধান তুলসি গ্যাবার্ড আইআরজিসির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা এক ইরাকি কুর্দি নেতার সঙ্গে কথা বলেছেন। ওই মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে আইআরজিসির কমান্ডার জেনারেল আহমাদ ভাহিদির কাছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বার্তা পৌঁছানো হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

পরে ফক্স নিউজকে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্পও ওই যোগাযোগের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। মার্কিন প্রশাসনের অন্যতম উদ্বেগ ছিল, আলোচনায় যুক্ত থাকা ইরানি কর্মকর্তারা আইআরজিসির অবস্থান কতটা প্রতিনিধিত্ব করছেন। কারণ ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক কাঠামোর মধ্যে আইআরজিসির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

ট্রাম্পের জামাতা ও বিশেষ দূত জ্যারেড কুশনারও ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরান সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগ আরও সক্রিয় হতে পারে। তার এই মন্তব্যকে অনেকেই সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা রাখার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।

ওমানকে ঘিরেও উত্তেজনা

হরমুজ প্রণালী নিয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যেও আলোচনা চলছে। তেহরানের দাবি, প্রণালী পরিচালনা নিয়ে দুই দেশ একটি সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছেছে। তবে ওমান যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা অংশীদার হওয়ায় বিষয়টি ওয়াশিংটনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

এ নিয়ে ওমানকে সরাসরি সতর্ক করেছেন ট্রাম্প। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালী নিয়ে ওমান কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি করলে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে।

ট্রাম্পের এই হুমকি মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। কারণ হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা শুধু ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ওমানের বিষয় নয়; বিশ্বের বৃহৎ তেল ও গ্যাস আমদানিকারক দেশগুলোর অর্থনীতিও এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। এরই মধ্যে সংঘাতের কারণে বাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির চাপ আবারও তীব্র হতে পারে।

অর্থনীতিতে বাড়ছে চাপ

দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কারণে ইরানের অর্থনীতিও ক্রমেই চাপে পড়ছে। সংঘাত শুরুর আগেই দেশটি উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল মুদ্রা, জ্বালানি সংকট এবং দীর্ঘদিনের মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে অর্থনৈতিক সংকটে ছিল। যুদ্ধ পরিস্থিতি সেই সংকটকে আরও গভীর করেছে।

যুদ্ধের কারণে ইরানের বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উৎপাদন ও বাণিজ্য কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে এবং পরিবহনব্যবস্থায়ও চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠনে সরকারকে বড় ধরনের অতিরিক্ত ব্যয় করতে হচ্ছে।

ইরানের অর্থনীতির ওপর সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ালে। তেল রপ্তানি, ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করা হলে তেহরানের বৈদেশিক মুদ্রা আয় আরও কমে যেতে পারে।

এর প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। খাদ্য, জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে পারে। জাতীয় মুদ্রার ওপর চাপ বাড়লে আমদানি ব্যয় আরও বেড়ে যাবে। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

ইরানের কয়েকজন কর্মকর্তা আশঙ্কা করছেন, অর্থনৈতিক দুর্ভোগ বাড়তে থাকলে দেশে নতুন করে বিক্ষোভ দেখা দিতে পারে। এতে সরকারের ওপর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপও বাড়বে। ফলে তেহরানের জন্য যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া যেমন ব্যয়বহুল, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কঠিন শর্তে সমঝোতায় পৌঁছানোও রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।

সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত এখন আবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে পৌঁছেছে। একদিকে ইরান অগ্রিম ও আক্রমণাত্মক সামরিক অবস্থানে যাওয়ার হুমকি দিচ্ছে, অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়াতে আগ্রহী নয়। এর মধ্যেও গোপন যোগাযোগের মাধ্যমে কূটনৈতিক সমাধানের একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

তবে হরমুজ প্রণালী নিয়ে বিরোধ, পারমাণবিক কর্মসূচি, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং যুদ্ধের অর্থনৈতিক ক্ষতি—এই চারটি বিষয় দ্রুত সমাধান না হলে সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর যুদ্ধ যদি নতুন করে তীব্র হয়, তাহলে তার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, মূল্যস্ফীতি, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপরও বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ১০:৫৮ এএম | মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬

9 News Bd |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

এ বিভাগের আরও খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
------
Contact

-----------------

ফোন : --------------------

E-mail: -----------------------