আন্তর্জাতিক ডেস্ক | বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬ | প্রিন্ট

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ও শান্তিচুক্তি নিয়ে আলোচনা এখনও অচলাবস্থায় রয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক সংঘাত স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে দুই দেশের মধ্যে মতবিরোধ কাটেনি। অন্তর্বর্তী শান্তিচুক্তি পুনরুজ্জীবিত করা এবং তা বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণের বিষয়ে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আলোচনা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে জানিয়েছেন ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।
মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে নতুন করে জাহাজে হামলার ঘটনা এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানের নেতাদের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক কঠোর বক্তব্যের মধ্যেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এতে দুই দেশের মধ্যে চলমান সংকট নিরসনের সম্ভাবনা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী চুক্তি হয়েছিল। ওই চুক্তিতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সামরিক অভিযান তাৎক্ষণিক ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করার কথা বলা হয়। তবে চুক্তিটি বেশিদিন কার্যকর থাকেনি। গত ৭ জুলাই ট্রাম্প চুক্তিটিকে ‘শেষ হয়ে গেছে’ বলে ঘোষণা করেন। এর এক সপ্তাহ পর ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, চুক্তিটি স্থগিত করা হয়েছে।
চুক্তি ভেঙে যাওয়ার জন্য দুই দেশই পরস্পরকে দায়ী করছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, চুক্তির আওতায় হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি ইরান দিয়েছিল, তা তেহরান পূরণ করেনি। অন্যদিকে ইরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রও চুক্তির অধীনে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করেনি। বিশেষ করে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ প্রত্যাহার এবং আটকে থাকা ইরানি সম্পদ ছেড়ে দেওয়ার বিষয়গুলোতে ওয়াশিংটন প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি বলে অভিযোগ তেহরানের।
ইরানের ওই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রকে অন্তর্বর্তী চুক্তিতে ফিরিয়ে আনা এবং চুক্তির প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের জন্য একটি সময়সীমা নির্ধারণের বিষয় উঠে এসেছে। তবে এসব বিষয়ে কোনো সমঝোতা হয়নি। তার ভাষায়, আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে ‘একেবারেই কোনো অগ্রগতি’ হয়নি।
এদিকে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি নিয়ে দুই দেশের অবস্থানও সম্পূর্ণ বিপরীত। বুধবার ট্রাম্প দাবি করেন, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ রয়েছে। তার এই মন্তব্যের পর উত্তেজনা আরও বাড়ে।
তবে ইরানের গঠিত পারস্য উপসাগরীয় প্রণালি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি এখনও বন্ধ রয়েছে। ইরানের শর্ত মেনে না নেওয়া পর্যন্ত নৌপথটি পুনরায় খুলে দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই বলেও তারা জানিয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথ। বিশ্বের বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে দীর্ঘ সময় নৌপথটি বন্ধ থাকলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর প্রভাব পড়তে পারে তেলের দাম, পরিবহন ব্যয় এবং বিশ্ব অর্থনীতির ওপর।
এর মধ্যেই ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ইরান শুধু কথা বলে, কোনো কাজ করে না। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ‘দাদাগিরি’ আর নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ট্রাম্পের এমন বক্তব্যের পর তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে কূটনৈতিক সমঝোতার পথ আরও কঠিন হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দুই পক্ষের মধ্যে আস্থার সংকটই এখন আলোচনার সবচেয়ে বড় বাধা। যুক্তরাষ্ট্র যেমন ইরানের কাছ থেকে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিভিন্ন নিশ্চয়তা চাইছে, তেমনি ইরানও অবরোধ প্রত্যাহার, সম্পদ ছাড় এবং মার্কিন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা দাবি করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতি বা অন্তর্বর্তী চুক্তি পুনর্বহাল করতে হলে দুই পক্ষকেই কিছু বিষয়ে ছাড় দিতে হবে। কিন্তু সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও নৌপথে হামলার ঘটনায় আপাতত সেই সম্ভাবনা দুর্বল হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অচলাবস্থা অব্যাহত থাকলে আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে।
এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সরাসরি আলোচনা শুরু হবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। মধ্যস্থতাকারীদের তৎপরতা অব্যাহত থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত স্থায়ী শান্তিচুক্তির সম্ভাবনা খুবই সীমিত বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।

Posted ৬:২৩ এএম | বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬
9 News Bd | s s


