নিজস্ব প্রতিবেদক | সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬ | প্রিন্ট

আর্থিক খাতে সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত এবং আমানতকারী ও অন্যান্য পাওনাদারের স্বার্থ সংরক্ষণের লক্ষ্যে চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোকে রেজল্যুশনের আওতায় এনে প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।
অকার্যকর ঘোষণা করা প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—আভিভা ফাইন্যান্স লিমিটেড, ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড।
রোববার রাতে বাংলাদেশ ব্যাংক এ তথ্য জানায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তের পর প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সক্ষমতা ও পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা পর্যালোচনা করে অকার্যকর ঘোষণা এবং রেজল্যুশনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিবেচনায় বড় অঙ্কের মূলধন ঘাটতি, উচ্চমাত্রার শ্রেণিকৃত ঋণ ও বিনিয়োগ, প্রয়োজনীয় তারল্য সংরক্ষণে ব্যর্থতা, আয়ক্ষমতার অবনতি এবং আমানতকারী ও অন্যান্য পাওনাদারের দায় পরিশোধে অক্ষমতা—এসব কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর ঘোষণা করা হয়েছে।
রেজল্যুশন কার্যক্রম দ্রুত ও কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের প্রশাসক ও সহযোগী প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তারা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসন, ব্যবস্থাপনা ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়া সরাসরি তদারক করবেন।
আভিভা ফাইন্যান্সে অস্থায়ী প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংক সুপারভিশন ডিপার্টমেন্ট-১১-এর পরিচালক মো. আলাউদ্দীন হোসেন। সহযোগী প্রশাসক হিসেবে রয়েছেন অতিরিক্ত পরিচালক এ কে এম গোলাম বহুলুল ও মো. মাহবুবুর রহমান।
এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টে প্রশাসক করা হয়েছে ব্যাংক সুপারভিশন ডিপার্টমেন্ট-২-এর পরিচালক আবু সামা মো. আতাউর রহমানকে। সহযোগী প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন অতিরিক্ত পরিচালক রোকসানা আক্তার ও মোহাম্মদ জয়নুল আবেদীন বসির।
ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টে প্রশাসকের দায়িত্ব পেয়েছেন ব্যাংক সুপারভিশন ডিপার্টমেন্ট-১০-এর পরিচালক মো. সাদেকুর রহমান। সহযোগী প্রশাসক হিসেবে রয়েছেন অতিরিক্ত পরিচালক সাদরিল আহমেদ ও মো. আল-আমিন।
ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসে প্রশাসক করা হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক ট্রেনিং একাডেমির পরিচালক মোহাম্মদ ইকবাল হোসেনকে। সহযোগী প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন অতিরিক্ত পরিচালক ফরিদ উদ্দীন আহমেদ ও জহিরুল ইসলাম ভূঁইয়া।
বাংলাদেশ ব্যাংক আশা করছে, এ পদক্ষেপের মাধ্যমে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ও সুশাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার পাশাপাশি আমানতকারী ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পক্ষের স্বার্থ সংরক্ষণে কার্যকর অগ্রগতি হবে। জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতেই আইন অনুযায়ী এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এফএএস ফাইন্যান্সের খেলাপি ঋণের হার ছিল ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ। ফারইস্ট ফাইন্যান্সে এ হার ৯৮ দশমিক ৫০ শতাংশ, আভিভা ফাইন্যান্সে ৯৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে ৯৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ।
এর আগে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থতা, উচ্চ খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতির মতো কারণ বিবেচনায় গত বছর নয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে সমস্যাগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। চারটি প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর ঘোষণার পর তালিকায় থাকা বাকি পাঁচটি প্রতিষ্ঠান হলো—পিপলস লিজিং, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি, প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স ও প্রাইম ফাইন্যান্স।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সংকটে থাকা নয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক আমানত রয়েছে ১৫ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের অর্থ ৩ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা। বাকি ১১ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা বিভিন্ন ব্যাংক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের আমানত।
সবচেয়ে বেশি ব্যক্তি আমানত আটকে আছে পিপলস লিজিংয়ে—১ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা। এছাড়া আভিভা ফাইন্যান্সে ৮০৯ কোটি, ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে ৬৪৫ কোটি এবং প্রাইম ফাইন্যান্সে ৩২৮ কোটি টাকা সাধারণ আমানতকারীদের অর্থ রয়েছে।
দেশে বর্তমানে মোট ৩৫টি ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে ২০টিকে সমস্যাগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব প্রতিষ্ঠানের মোট ঋণের পরিমাণ ২৫ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২১ হাজার ৪৬২ কোটি টাকাই খেলাপি, যা মোট ঋণের ৮৩ দশমিক ১৬ শতাংশ। বিপরীতে এসব ঋণের বিপরীতে বন্ধকি সম্পদের মূল্য মাত্র ৬ হাজার ৮৯৯ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ২৬ শতাংশ।
অন্যদিকে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকা ১৫টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৭ শতাংশ। ২০২৪ সালে এসব প্রতিষ্ঠান ১ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। একই সময়ে তাদের মূলধন উদ্বৃত্ত ছিল ৬ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত বছরের জুন শেষে আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ২৭ হাজার ৫৪১ কোটি টাকা, যা এ খাতে বিতরণ করা মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭২ শতাংশ।

Posted ৬:০৯ এএম | সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬
9 News Bd | s s


