ফোকাসবাংলা২৪ ডেস্ক | সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬ | প্রিন্ট
জীবনের মতো ফুটবলেও সময়ের নিজস্ব নিয়ম আছে। একসময় যারা মাঠ শাসন করেছেন, তারাও একদিন বিদায় নেন। ২০২৬ বিশ্বকাপ যেন সেই নির্মম সত্যকেই নতুন করে সামনে এনে দিল। লিওনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, লুকা মদ্রিচ, নেইমার—দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্ব ফুটবলকে রাঙিয়ে তোলা এই কিংবদন্তিদের বিশ্বকাপ অধ্যায় সম্ভবত এখানেই শেষ।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অমর পঙ্ক্তি— “যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে…”— যেন আজ ফুটবল বিশ্বেরই অনুভূতি। এক সময় যে সব পায়ের ছোঁয়ায় বিশ্বকাপের মঞ্চ আলোকিত হয়েছে, আগামী আসরে হয়তো সেই পদচিহ্ন আর দেখা যাবে না।
২০২৬ সালের বিশ্বকাপ শুধু নতুন চ্যাম্পিয়ন খোঁজার প্রতিযোগিতা ছিল না; এটি ছিল একটি যুগের সমাপ্তির সাক্ষী। যে প্রজন্ম কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীকে আনন্দ, আবেগ ও বিস্ময়ে ভাসিয়েছে, তাদের বিদায়ের মুহূর্তও হয়ে থাকল এই আসর।
পর্তুগালের অধিনায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ৪১ বছর বয়সে ইতিহাস গড়ে টানা ষষ্ঠ বিশ্বকাপে খেলেছেন। আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বোচ্চ গোলদাতা এই মহাতারকা ইতোমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছেন, এটিই তার শেষ বিশ্বকাপ। দীর্ঘ দুই দশকের ক্যারিয়ারে অসংখ্য রেকর্ড নিজের করে নেওয়া রোনালদোর বিদায়ের মধ্য দিয়ে শেষ হচ্ছে ফুটবলের এক গৌরবময় অধ্যায়।
আর্জেন্টিনাকে ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জেতানো লিওনেল মেসি ২০২৬ সালেও দলকে ফাইনালে তুলেছিলেন। কিন্তু শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত পূরণ হয়নি। ৩৯ বছর বয়সী মেসি এখনও আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেননি। তবে বয়স ও শারীরিক বাস্তবতা বিবেচনায় অনেকের ধারণা, স্পেনের বিপক্ষে বিশ্বকাপের ফাইনালই হয়তো তার ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ হয়ে থাকবে।
বিশ্বকাপে ছয়টি আসর, অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত এবং অবশেষে কাঙ্ক্ষিত শিরোপা—মেসির বিশ্বকাপ যাত্রা ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা অধ্যায় হয়ে থাকবে।
ক্রোয়েশিয়ার কিংবদন্তি মিডফিল্ডার লুকা মদ্রিচ ৪০ বছর বয়সেও দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন অনবদ্য দক্ষতায়। ২০১৮ সালে দলকে ফাইনালে তোলা এই মিডফিল্ড জাদুকর শেষ বিশ্বকাপেও নিজের অভিজ্ঞতার ছাপ রেখেছেন। তবে বয়সের কারণে তারও আর ২০৩০ সালের বিশ্বকাপে খেলার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
ব্রাজিলের তারকা নেইমার জুনিয়রের ক্যারিয়ার বারবার থমকে গেছে চোটের কারণে। ৩৪ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ডকে নিয়েও ছিল অনিশ্চয়তা। শেষ পর্যন্ত কোচ কার্লো আনচেলত্তি তাকে দলে রাখলেও ব্রাজিলের বিদায়ের পর নেইমারের একটি মন্তব্য ভবিষ্যৎ নিয়ে জোর আলোচনা তৈরি করেছে।
তিনি বলেছেন, “এখানেই শুরু, এখানেই শেষ।”
যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে অবসরের ঘোষণা দেননি, তবুও অনেকের মতে এটিই বিশ্বকাপে নেইমারের শেষ উপস্থিতি।
শুধু মেসি, রোনালদো বা মদ্রিচ নন, আরও কয়েকজন বিশ্বখ্যাত ফুটবলারের বিশ্বকাপ অধ্যায়েরও ইতি ঘটতে পারে। তাদের মধ্যে রয়েছেন জার্মানির কিংবদন্তি গোলরক্ষক ম্যানুয়েল ন্যয়ার, যিনি আধুনিক ফুটবলে ‘সুইপার-কিপার’ ধারণাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। এছাড়া বেলজিয়ামের কেভিন ডি ব্রুইনা, মিশরের মোহামেদ সালাহ, নেদারল্যান্ডসের ভার্জিল ভ্যান ডাইক, দক্ষিণ কোরিয়ার সন হিউং-মিন এবং মেক্সিকোর অভিজ্ঞ গোলরক্ষক গিলের্মো ওচোয়ারও আগামী বিশ্বকাপে খেলার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।
এ ছাড়া আর্জেন্টিনার নিকোলাস ওটামেন্ডি, ব্রাজিলের কাসেমিরো, বসনিয়ার এডিন জেকো এবং স্কটল্যান্ডের ক্রেইগ গর্ডনের মতো অভিজ্ঞ ফুটবলারদেরও বিশ্বকাপ ক্যারিয়ার সম্ভবত শেষ হয়ে গেছে।
একদিকে কিংবদন্তিদের বিদায়, অন্যদিকে নতুন তারকাদের উত্থান—এটাই ফুটবলের চিরন্তন নিয়ম। আগামী বিশ্বকাপে হয়তো দেখা যাবে নতুন সব মুখ, নতুন প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং নতুন নায়কদের। কিন্তু মেসির বাঁ পায়ের জাদু, রোনালদোর আকাশছোঁয়া হেড, মদ্রিচের নিখুঁত পাস কিংবা নেইমারের সৃজনশীল ড্রিবল—এসব স্মৃতি ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে অমলিন হয়ে থাকবে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে অনেক মহান ফুটবলার এসেছেন, আবার বিদায়ও নিয়েছেন। কিন্তু কিছু নাম সময়কে অতিক্রম করে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়। মেসি, রোনালদো, মদ্রিচ ও নেইমার সেই বিরল কাতারেরই সদস্য।
তাদের পায়ের ছাপ হয়তো আর বিশ্বকাপের সবুজ গালিচায় পড়বে না। কিন্তু ফুটবল ইতিহাসের পাতায়, কোটি ভক্তের হৃদয়ে এবং বিশ্বকাপের অমর স্মৃতিতে তারা চিরকাল অম্লান থাকবেন।
Posted ১০:৫৫ পূর্বাহ্ণ | সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬
9 News Bd | s s