শিরোনাম >>
শিরোনাম >>

তালোড়া পৌরসভা, বগুড়ায় ‘কৃষিপণ্য রপ্তানি অঞ্চল’ প্রতিষ্ঠা: যৌক্তিকতা ও অর্থনৈতিক প্রভাব

এ.কে.এম. রোকনুজ্জামান খন্দকার   |   বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬   |   প্রিন্ট

তালোড়া পৌরসভা, বগুড়ায় ‘কৃষিপণ্য রপ্তানি অঞ্চল’ প্রতিষ্ঠা: যৌক্তিকতা ও অর্থনৈতিক প্রভাব

বগুড়ার তালোড়া পৌরসভায় একটি বিশেষায়িত ‘কৃষিপণ্য রপ্তানি অঞ্চল (Agricultural Produce Export Zone)’ প্রতিষ্ঠা আজ সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের কৃষিখাতের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হবে। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ২০২৬-এর অগ্রগতি প্রতিবেদনে তালোড়াকে এ প্রকল্পের জন্য একটি উপযুক্ত স্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান এবং সড়ক, রেল, বিমান ও নৌপথের সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থা তালোড়াকে দেশের কৃষিপণ্য রপ্তানির অন্যতম সম্ভাবনাময় কেন্দ্রে পরিণত করতে পারে।
১. ভৌগোলিক সুবিধা ও ভূমির প্রাপ্যতা 
বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তরাঞ্চলের অন্য যেকোনো স্থানের তুলনায় তালোড়া এ প্রকল্পের জন্য অধিক উপযোগী।
উর্বর কৃষিজমি সংরক্ষণ: জাতীয় নীতিমালা অনুযায়ী বহুফসলি কৃষিজমি রক্ষা করে প্রকল্পের স্থান নির্বাচন করা হয়েছে, ফলে উৎপাদনশীল জমি নষ্ট হবে না।
অনাবাদি জমির ব্যবহার: তালোড়া পৌরসভার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমি বর্তমানে অনাবাদি অথবা একফসলি, যা উন্নয়নের আওতায় আনা সম্ভব।
সরকারি খাস ও রেলওয়ে জমির ব্যবহার: নাগর নদীর তীরবর্তী প্রায় ৪৩ একর সরকারি খাস জমি এবং প্রায় ১৫ একর অব্যবহৃত রেলওয়ে জমি উন্নয়নের মাধ্যমে শিল্প স্থাপনের উপযোগী করা যেতে পারে।
২. বহুমুখী যোগাযোগ ব্যবস্থা ও লজিস্টিকস হাব
কৃষিপণ্য দ্রুত সংগ্রহ ও স্বল্প ব্যয়ে পরিবহন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তালোড়ার অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ক. সড়ক যোগাযোগ
তালোড়া বগুড়া-নওগাঁ মহাসড়কের খুব কাছাকাছি অবস্থিত, যা সরাসরি চার লেনের ঢাকা-রংপুর জাতীয় মহাসড়কের সঙ্গে সংযুক্ত।
এর ফলে ঢাকা ও চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে কৃষিপণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে।
খ. রেল যোগাযোগ
তালোড়া দেশের বৃহত্তম রেল জংশন সান্তাহার এবং কৌশলগত রানীনগর জংশনের মাত্র ২০ কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত।
বগুড়া-সান্তাহার-তালোড়া রেলপথে ডুয়েল গেজ সংযোগ থাকায় সরাসরি খুলনা ও মোংলা বন্দরে পণ্য পরিবহন সম্ভব।
সিরাজগঞ্জ, দিনাজপুর, চিলাহাটি, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, জয়পুরহাট, রংপুর ও বগুড়া থেকে আম, আলু, ধানসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য সহজেই তালোড়ায় এনে প্রক্রিয়াজাত ও রপ্তানি করা যাবে।
গ. বিমান ও নৌপথ
উচ্চমূল্যের ও দ্রুত নষ্ট হওয়া কৃষিপণ্য যেমন ফল, সবজি ও ফুল রপ্তানির জন্য বিমান পরিবহন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রস্তাবিত বগুড়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর তালোড়া থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এটি চালু হলে Agri-Based Cargo Service-এর মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সরাসরি কৃষিপণ্য রপ্তানি করা সম্ভব হবে।
এছাড়া বগুড়ার সারিয়াকান্দি ও ধুনটে নদীবন্দর প্রতিষ্ঠার সরকারি গেজেট ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে, যা এ অঞ্চলের লজিস্টিক সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করবে।
ঘ. ধান উৎপাদন ও রাইস মিল শিল্প
তালোড়া দেশের অন্যতম প্রধান ধান উৎপাদনকারী অঞ্চল এবং এখানে আধুনিক অটো রাইস মিলের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। উন্নত সড়ক ও রেল যোগাযোগের কারণে তালোড়া থেকে ঢাকা ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে চাল পরিবহন অত্যন্ত সহজ। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে চাল রপ্তানির ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম।
৩. তুলনামূলক মূল্যায়ন: তালোড়া বনাম বাগদা ফার্ম
গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার বাগদা ফার্ম এলাকাও বিবেচনায় থাকলেও বিশেষজ্ঞদের মতে তালোড়াই অধিক উপযোগী।
বাগদা ফার্ম থেকে বিমানবন্দর ও নদীবন্দরের দূরত্ব বেশি এবং রেল যোগাযোগও তুলনামূলকভাবে সীমিত। অন্যদিকে উত্তরবঙ্গের ভৌগোলিক কেন্দ্র হিসেবে তালোড়া সড়ক, রেল, বিমান ও নৌপথের সমন্বিত সুবিধা প্রদান করে, যা দীর্ঘমেয়াদে অধিক লাভজনক ও টেকসই।
৪. প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন
রুরাল ডেভেলপমেন্ট একাডেমি (RDA), বগুড়া আনুষ্ঠানিকভাবে তালোড়ায় কৃষিপণ্য রপ্তানি অঞ্চল প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করেছে।
“তালোড়া উত্তরবঙ্গের কেন্দ্রবিন্দু। সড়ক, রেল, বিমান ও নৌপথের সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থা এটিকে একটি আদর্শ ও টেকসই শিল্পাঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলার উপযুক্ত স্থান করেছে। টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য শিল্প ও কৃষির মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
ড. মো. আব্দুল মজিদ প্রামাণিক
মহাপরিচালক (চলতি দায়িত্ব), রুরাল ডেভেলপমেন্ট একাডেমি (RDA), বগুড়া।
৫. উপসংহার ও অর্থনৈতিক প্রভাব
তালোড়ায় ‘কৃষিপণ্য রপ্তানি অঞ্চল’ প্রতিষ্ঠা শুধু উত্তরাঞ্চলের একটি আঞ্চলিক দাবি নয়, বরং এটি জাতীয় অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির একটি কৌশলগত উদ্যোগ।
বিদ্যমান অবকাঠামো ও বহুমুখী যোগাযোগ ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে এ অঞ্চল দেশের কৃষিপণ্য রপ্তানির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। এর ফলে কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হবে, নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং দেশের জিডিপি ও রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
অতএব, জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং উত্তরাঞ্চলকে আন্তর্জাতিক মানের কৃষি ও লজিস্টিকস হাবে পরিণত করার লক্ষ্যে তালোড়ায় ‘কৃষিপণ্য রপ্তানি অঞ্চল’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন করা সময়ের দাবি।

এ.কে.এম. রোকনুজ্জামান খন্দকার
পিএইচডি গবেষণা ফেলো
ইতিহাস বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ১২:৩৬ পিএম | বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬

9 News Bd |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

রানুর কবিতা
(216 বার পঠিত)
advertisement
advertisement
advertisement

এ বিভাগের আরও খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
------
Contact

-----------------

ফোন : --------------------

E-mail: -----------------------