সম্পাদকীয় | মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬ | প্রিন্ট
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে হাম রোগের সংক্রমণ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। একসময় টিকাদান কর্মসূচির সাফল্যের কারণে নিয়ন্ত্রণে চলে আসা এই রোগ আবারও বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি করছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন যে, টিকাদানের আওতায় সামান্য ঘাটতিও হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক রোগকে পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার সুযোগ করে দিতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই।
হাম একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা মূলত শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা গেলেও যেকোনো বয়সের মানুষ এতে আক্রান্ত হতে পারেন। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং শরীরে লালচে ফুসকুড়ি হামের সাধারণ লক্ষণ। অনেক ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, অপুষ্টি এবং মস্তিষ্কে প্রদাহের মতো জটিলতাও দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের জন্য হাম প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরে জনস্বাস্থ্যের একটি সফল উদ্যোগ হিসেবে স্বীকৃত। হাম ও রুবেলা প্রতিরোধে নিয়মিত টিকাদানের পাশাপাশি বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে লাখো শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়েছে। তবে করোনাভাইরাস মহামারির সময় অনেক এলাকায় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হয়। পাশাপাশি কিছু অঞ্চলে টিকা সম্পর্কে ভুল ধারণা, সচেতনতার অভাব এবং দুর্গম এলাকায় স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক শিশু নির্ধারিত সময়ের টিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এর ফলে জনসংখ্যার একটি অংশ সংক্রমণের ঝুঁকিতে থেকে গেছে।
হামের বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা উভয়ই সামনে নিয়ে এসেছে। দেশের সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন। চিকিৎসক, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা আন্তরিকভাবে দায়িত্ব পালন করলেও জনবল সংকট, শয্যার অভাব এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের সীমিত প্রাপ্যতা অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর সেবা প্রদানে বাধা সৃষ্টি করে। কোনো এলাকায় হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে স্থানীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়, যা অন্যান্য রোগীর চিকিৎসাকেও প্রভাবিত করতে পারে।
এ ক্ষেত্রে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে আরও শক্তিশালী করা জরুরি। ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, কমিউনিটি ক্লিনিক এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে রোগ শনাক্তকরণ ও দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। হামের সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ, সংক্রমণ পর্যবেক্ষণ এবং আক্রান্ত এলাকার শিশুদের দ্রুত টিকাদানের আওতায় আনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে রোগতাত্ত্বিক নজরদারি ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও কার্যকর করতে হবে, যাতে সংক্রমণের প্রবণতা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো শতভাগ টিকাদান নিশ্চিত করা। এ ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন এবং গণমাধ্যমেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। টিকা সম্পর্কে গুজব ও বিভ্রান্তি দূর করতে সচেতনতামূলক প্রচার জোরদার করতে হবে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভুয়া তথ্যের বিরুদ্ধে বিজ্ঞানভিত্তিক ও নির্ভরযোগ্য তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশ অতীতে সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে হাম নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব। তবে এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, দক্ষ জনবল এবং সমন্বিত জনস্বাস্থ্য পরিকল্পনা। চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়ন কেবল হাসপাতাল নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা, টিকাদান, জনসচেতনতা এবং দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ ব্যবস্থাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
হামের পুনরুত্থান আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এই বার্তাকে গুরুত্ব দিয়ে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে আরও বড় জনস্বাস্থ্য সংকটের মুখোমুখি হতে হতে পারে দেশ। তাই প্রতিটি শিশুর টিকাদান নিশ্চিত করা, চিকিৎসা ব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং জনস্বাস্থ্য অবকাঠামোকে শক্তিশালী করাই হওয়া উচিত সময়ের প্রধান অগ্রাধিকার। তাহলেই হামমুক্ত ও সুস্থ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথ আরও সুগম হবে।
Posted ২:৪৭ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
9 News Bd | s s