নিজস্ব প্রতিবেদক | শনিবার, ২০ জুন ২০২৬ | প্রিন্ট

প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে রিকন্ডিশন্ড গাড়ির ওপর করভার বৃদ্ধির ফলে মধ্যবিত্তের জন্য গাড়ি কেনা আরও কঠিন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ রিকন্ডিশন ভেহিকেলস ইমপোর্টার্স অ্যান্ড ডিলারস অ্যাসোসিয়েশন (বারভিডা)। সংগঠনটির দাবি, নতুন সিসি স্ল্যাব কাঠামো এবং শুল্ক বৃদ্ধির কারণে জনপ্রিয় ও জ্বালানি সাশ্রয়ী রিকন্ডিশন্ড গাড়ির দাম উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে, যা বাজারে বৈষম্য সৃষ্টি করবে এবং এ খাতের ব্যবসাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
শনিবার (২০ জুন) রাজধানীর ঢাকা ক্লাবের স্যামসন এইচ চৌধুরী হলে প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব উদ্বেগ ও দাবি তুলে ধরেন বারভিডার সভাপতি আব্দুল হক। এ সময় সংগঠনের মহাসচিব রিয়াজ রহমান, সাবেক সভাপতি হাবিবুল্লাহ ডন ও মান্নান চৌধুরী খসরুসহ বর্তমান ও সাবেক নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে আব্দুল হক বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে সিসি স্ল্যাব পুনর্গঠনের ফলে নতুন ও রিকন্ডিশন্ড গাড়ির মধ্যে শুল্ক বৈষম্য আরও বেড়ে যাবে। অনেক ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে যেখানে রিকন্ডিশন্ড গাড়ির দাম নতুন গাড়ির চেয়েও বেশি হয়ে যেতে পারে। তিনি বলেন, এটি বাজারের স্বাভাবিক প্রতিযোগিতার পরিপন্থী এবং ভোক্তাদের জন্যও অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করবে।
বারভিডার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১-১৫০০ সিসি শ্রেণির পরিবর্তে ১-১২০০ সিসি এবং ১২০১-১৬০০ সিসি নামে নতুন স্ল্যাব নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে জনপ্রিয় ও জ্বালানি সাশ্রয়ী রিকন্ডিশন্ড গাড়ির ওপর মোট করভার ১৩২ দশমিক ৩৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৫৯ দশমিক ৮০ শতাংশে উন্নীত হবে। সংগঠনটির মতে, এ সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর, যারা তুলনামূলক সাশ্রয়ী রিকন্ডিশন্ড গাড়ির প্রধান ক্রেতা।
বারভিডা হিসাব করে দেখিয়েছে, নতুন কর কাঠামো কার্যকর হলে ফুয়েলচালিত একটি রিকন্ডিশন্ড টয়োটা প্রিমিওর দাম প্রায় ৩ লাখ টাকা এবং একটি টয়োটা এক্সিওর দাম প্রায় আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। এতে সাধারণ ক্রেতাদের গাড়ি কেনার সক্ষমতা কমে যাবে এবং বাজারে চাহিদা হ্রাস পাবে।
সংগঠনটির সভাপতি জানান, দেশে ইতোমধ্যে মোটরযানের নিবন্ধন সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। কয়েক বছর আগে যেখানে বছরে প্রায় ২১ হাজার গাড়ির নিবন্ধন হতো, বর্তমানে তা কমে প্রায় ৯ হাজার ৪০০-তে নেমে এসেছে। নতুন কর কাঠামো কার্যকর হলে আগামী অর্থবছরে এই সংখ্যা আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, দেশে রিকন্ডিশন্ড মোটরযান খাতে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার স্থানীয় বিনিয়োগ রয়েছে। এ খাত থেকে প্রতিবছর প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়। পাশাপাশি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। ব্যাংক, লিজিং কোম্পানি, বীমা প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সেবা খাতও এ শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এ খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়লে জাতীয় অর্থনীতির বিভিন্ন খাতেও তার প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।
প্রস্তাবিত বাজেটে বৈদ্যুতিক গাড়ির (ইভি) জন্য উল্লেখযোগ্য শুল্ক সুবিধা দেওয়ার বিষয়টিকে স্বাগত জানালেও বারভিডা মনে করে, দেশের বর্তমান বাস্তবতায় শুধুমাত্র ইভিনির্ভর নীতি যথেষ্ট নয়। সংগঠনটির নেতারা বলেন, দেশে এখনো পর্যাপ্ত চার্জিং অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। ফলে শুল্ক সুবিধার সুফল তাৎক্ষণিকভাবে সাধারণ ভোক্তাদের কাছে পৌঁছাবে না।
অন্যদিকে, জ্বালানি সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব হাইব্রিড গাড়ির জন্য দেশে ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ অবকাঠামো তৈরি হয়েছে। তাই টেকসই পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বৈদ্যুতিক গাড়ির পাশাপাশি হাইব্রিড ও প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ির জন্যও সমান নীতিগত সহায়তা দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
বারভিডার অভিযোগ, সরকার ব্র্যান্ড নিউ প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ির ক্ষেত্রে শুল্ক সুবিধা দিলেও রিকন্ডিশন্ড প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ির ওপর ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক বহাল রেখেছে। এর ফলে একই প্রযুক্তির নতুন ও রিকন্ডিশন্ড গাড়ির মধ্যে বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। সংগঠনটি দাবি জানিয়েছে, ব্র্যান্ড নিউ ও রিকন্ডিশন্ড উভয় ধরনের প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ির জন্য সম্পূরক শুল্ক ও রেগুলেটরি শুল্ক সমান হারে নির্ধারণ করতে হবে। একই সুবিধা মাইক্রোবাসের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করার আহ্বান জানানো হয়।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে আরও প্রস্তাব করা হয়, ২০০১ থেকে ২০২৫ সিসি ক্ষমতার প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ির সম্পূরক শুল্ক ৩০ শতাংশ নির্ধারণ এবং জ্বালানি সাশ্রয়ী হাইব্রিড গাড়িকেও প্লাগ-ইন হাইব্রিডের মতো কর সুবিধা দেওয়া উচিত।
সংবাদ সম্মেলনে ইলেকট্রিক রিকশাকে নিবন্ধন ও করের আওতায় আনারও প্রস্তাব দেন বারভিডা সভাপতি। তার মতে, এতে একদিকে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে, অন্যদিকে এ খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।
বারভিডা জানায়, বর্তমানে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানিতে ন্যূনতম ১৫৯ দশমিক ৮০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক দিতে হচ্ছে। এত উচ্চ করহার ব্যবসায়ীদের জন্য অসম প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করছে। এ কারণে সংগঠনটি দীর্ঘমেয়াদি, স্থিতিশীল ও যৌক্তিক কর কাঠামো প্রণয়ন, শুল্ক বৈষম্য দূরীকরণ এবং রিকন্ডিশন্ড মোটরযান শিল্পের টেকসই বিকাশে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা প্রদানের আহ্বান জানিয়েছে।
সংগঠনটির মতে, রিকন্ডিশন্ড গাড়ির বাজার সংকুচিত হলে শুধু ব্যবসায়ী নয়, সরকারও রাজস্ব আয়ে ক্ষতির মুখে পড়বে। তাই বাজেট চূড়ান্ত করার আগে মধ্যবিত্ত ক্রেতা, বিনিয়োগকারী এবং শিল্পের সামগ্রিক স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে প্রস্তাবিত কর কাঠামো পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।

Posted ৯:২১ এএম | শনিবার, ২০ জুন ২০২৬
9 News Bd | s s


