শিরোনাম >>
শিরোনাম >>
রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র‍্যাপিড) আয়োজিত সংলাপ

বাজেটে উচ্চাভিলাষী অর্থনৈতিক লক্ষ্য, তবে রপ্তানি বহুমুখীকরণে রয়ে গেছে প্রশ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬   |   প্রিন্ট

বাজেটে উচ্চাভিলাষী অর্থনৈতিক লক্ষ্য, তবে রপ্তানি বহুমুখীকরণে রয়ে গেছে প্রশ্ন

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে দেশের অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তরের ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেছে সরকার। সরকারের লক্ষ্য আগামী এক দশকেরও কম সময়ে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করা। তবে এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য অর্জনের পথে নীতিগত অসঙ্গতি ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারণী মহলের প্রতিনিধিরা।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র‍্যাপিড) আয়োজিত ‘২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট: অর্থনৈতিক প্রতিকূলতা মোকাবিলা’ শীর্ষক সংলাপে সরকারি পরিকল্পনা, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, রপ্তানি নীতি এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, নতুন বাজেটকে কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি মূলত দেশের অর্থনীতিকে একটি নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার কৌশলগত দলিল। তার মতে, উৎপাদনশীল খাত সম্প্রসারণ, মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে অর্থনীতির ভিত্তি আরও শক্তিশালী করা হবে।

তিনি বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টেকসই করতে হলে ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ সহজ করতে হবে। এ কারণে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং শিল্প খাতের জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালু করা, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়েও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।

উপদেষ্টা তিতুমীর জানান, ভবিষ্যতে করের হার বাড়ানোর পরিবর্তে করজাল সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি হ্রাস এবং রাজস্ব প্রশাসনের দক্ষতা বাড়ানোর মাধ্যমে সরকারের আয় বৃদ্ধি করা হবে। তার মতে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারিত হলে স্বাভাবিকভাবেই রাজস্ব আদায় বাড়বে। পাশাপাশি অপচয়, দুর্নীতি, জালিয়াতি ও প্রশাসনিক ত্রুটি কমিয়ে আনার মধ্যেও রাজস্ব বৃদ্ধির বড় সুযোগ রয়েছে।

তিনি বলেন, ঝুঁকিভিত্তিক অডিট ব্যবস্থা চালু এবং আমদানি মূল্যায়ন ও শুল্ক ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তিনির্ভর পদ্ধতির ব্যবহার বাড়ানো গেলে রাজস্ব ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা অনেকটাই বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া বিভিন্ন খাতে দীর্ঘদিন ধরে দেওয়া কর অব্যাহতি ও বিশেষ সুবিধা পুনর্মূল্যায়নের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

তবে বাজেটে ঘোষিত রপ্তানি বহুমুখীকরণের লক্ষ্য বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন দেশের শীর্ষ শিল্প উদ্যোক্তাদের একজন ও এপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর। তিনি বলেন, সরকার একদিকে তৈরি পোশাকের বাইরে নতুন নতুন রপ্তানি খাত গড়ে তোলার কথা বলছে, অন্যদিকে নীতিগত সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে এখনও পোশাক শিল্পকে কেন্দ্র করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।

তার মতে, প্রস্তাবিত বাজেটে কমপ্লায়েন্ট রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বার্ষিক বন্ডেড অডিটের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। কিন্তু একই ধরনের রপ্তানি কার্যক্রম পরিচালনাকারী চামড়া, জুতা, প্লাস্টিক, হালকা প্রকৌশল বা অন্যান্য শিল্পখাতের জন্য এমন কোনো সুবিধা রাখা হয়নি। এতে সরকারের ঘোষিত রপ্তানি বহুমুখীকরণ নীতির সঙ্গে বাস্তব পদক্ষেপের অসামঞ্জস্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

তিনি আরও বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে নিয়ম মেনে ব্যবসা পরিচালনা করছে এবং যাদের ঝুঁকির মাত্রা কম, তাদের ক্ষেত্রেও অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক বাধ্যবাধকতা কমানো উচিত। এতে ব্যবসার ব্যয় কমবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে।

নাসিম মঞ্জুর নতুন বাজেটে রপ্তানিমুখী খাতগুলোর জন্য কিছু ইতিবাচক উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন। বিশেষ করে নির্দিষ্ট কয়েকটি খাতে ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুযোগকে তিনি স্বাগত জানান। তবে এর সঙ্গে যুক্ত ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের শর্তকে বাস্তবতাবিবর্জিত বলে অভিহিত করেন।

তার ভাষ্য, দেশের তৈরি পোশাক শিল্পে স্থানীয় সরবরাহ চেইন শক্তিশালী হওয়ায় ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজন সম্ভব হলেও অন্যান্য শিল্পে এখনও সেই অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। ফলে একক মানদণ্ড আরোপ করলে নতুন রপ্তানি খাতগুলো প্রত্যাশিত সুবিধা পাবে না।

সংলাপে বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন অর্থনীতিবিদরা। র‍্যাপিডের চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক বলেন, কাগজে-কলমে বাজেট ঘাটতির পরিমাণ যতটা দেখানো হয়েছে, বাস্তবে তা আরও বড় হতে পারে। তার মতে, রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য এবং ব্যয় বাস্তবায়নের সক্ষমতা বিবেচনায় নিলে প্রকৃত ঘাটতি প্রায় চার লাখ কোটি টাকায় পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।

তিনি বলেন, বড় আকারের বাজেট ঘোষণা করাই যথেষ্ট নয়; এর অর্থায়নের উৎস, বাস্তবায়ন কাঠামো এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের মূলধারায় আনতে হলে শুধু বাজেট বরাদ্দ নয়, কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। সুশাসন ছাড়া সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের উপাচার্য ও উদ্যোক্তা ড. রুবানা হক বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বাজার পরিস্থিতি এবং নীতিগত পরিবর্তনের কারণে ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। তবে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে বেসরকারি খাত সরকারের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতাদের আলোচনায় স্পষ্ট হয়েছে, প্রস্তাবিত বাজেটে উচ্চ প্রবৃদ্ধি, রাজস্ব বৃদ্ধি এবং রপ্তানি সম্প্রসারণের উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন নীতিগত সামঞ্জস্য, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং বেসরকারি খাতের আস্থা অর্জন। অন্যথায় ঘোষিত লক্ষ্য ও বাস্তব ফলাফলের মধ্যে ব্যবধান থেকেই যেতে পারে।

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ১২:৩০ পিএম | বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬

9 News Bd |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

এ বিভাগের আরও খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
------
Contact

-----------------

ফোন : --------------------

E-mail: -----------------------