এ.কে.এম. রোকনুজ্জামান খন্দকার | সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬ | প্রিন্ট
“১৯৭২ সাল থেকে বাংলাদেশে ব্যাংকিং খাতের রূপান্তরের ইতিহাস”
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে কর্মরত অধিকাংশ মানুষ নিজেদের সমাজের একটি সম্মানজনক ও প্রতিষ্ঠিত শ্রেণির অংশ হিসেবে বিবেচনা করেন। পরিচ্ছন্ন পোশাক, টাই, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অফিস এবং কর্পোরেট পরিবেশ অনেকের কাছে ব্যাংকারদের একটি বিশেষ সামাজিক অবস্থানের প্রতীক।
কিন্তু বাস্তবতা কি সত্যিই এতটা আরামদায়ক?
মাসের বেতন অ্যাকাউন্টে জমা হওয়ার আগেই শুরু হয়ে যায় বিভিন্ন ঋণের কিস্তি কর্তন। ব্যক্তিগত ঋণ, ক্রেডিট কার্ড, গাড়ি ঋণ, গৃহঋণ, প্রভিডেন্ট ফান্ড ঋণসহ নানা আর্থিক দায়বদ্ধতায় অনেকের বেতনের বড় অংশ কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। প্রতিদিন দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, ব্যবসায়িক চাপ, গ্রাহকসেবা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করেও অধিকাংশ ব্যাংকার নিজেদের কখনো “শ্রমিক” হিসেবে ভাবেন না।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, শ্রম কি শুধু শারীরিক পরিশ্রমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ?
আধুনিক অর্থনীতিতে মানসিক, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং সেবাভিত্তিক শ্রমও সমানভাবে শ্রমের অন্তর্ভুক্ত। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাংকাররাও শ্রমের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানকে মুনাফা অর্জনে সহায়তা করেন। আর এখানেই আসে ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ড (WPPF) বা শ্রমিক মুনাফা অংশীদারিত্ব তহবিলের বিষয়টি।
WPPF কী?
বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর অধ্যায় ১৫ অনুযায়ী, মুনাফাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের জন্য একটি অংশীদারিত্ব তহবিল গঠন এবং প্রতিষ্ঠানের নিট মুনাফার ৫ শতাংশ নির্ধারিত অনুপাতে এই তহবিলে প্রদান করার বিধান রয়েছে।
আইন অনুযায়ী:
৮০% শ্রমিক অংশীদারিত্ব তহবিলে
১০% শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে
১০% বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনে
প্রদান করতে হয়।
ব্যাংকাররা কি এই সুবিধার আওতাভুক্ত?
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি উঠে আসে।
বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর ধারা ২৩৩-এ স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, মুনাফার উদ্দেশ্যে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, শিল্প, কারখানা, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বীমা কোম্পানির কার্যক্রম শিল্প-সম্পর্কিত কাজ হিসেবে বিবেচিত হবে।
অন্যদিকে ২০১৫ সালের ২৮ মে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিআরপিডি সার্কুলার লেটার নং-৭ এ ব্যাংকগুলোকে কর্মীদের চাকরি ও আর্থিক সুবিধার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) কনভেনশন, বাংলাদেশ শ্রম আইন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুসরণের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়।
ফলে শ্রম আইন ব্যাংকিং খাতে প্রযোজ্য কি না, সে বিষয়ে উল্লেখযোগ্য আইনি ভিত্তি বিদ্যমান।
বিতর্কের সূত্রপাত কোথায়?
কিছু ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে যুক্তি দিয়ে আসছে যে, ব্যাংক কোম্পানি আইনের নির্দিষ্ট কিছু ধারা এবং শ্রম আইনের মধ্যে সম্ভাব্য সাংঘর্ষিক ব্যাখ্যা রয়েছে। এই ব্যাখ্যার ভিত্তিতে অনেক প্রতিষ্ঠান WPPF প্রদানে অনীহা দেখিয়েছে।
তবে সমালোচকদের মতে, ব্যাংক কোম্পানি আইনের যেসব ধারা উদ্ধৃত করা হয়, সেগুলো মূলত মালিকপক্ষ বা ব্যবস্থাপক প্রতিনিধিদের জন্য প্রযোজ্য; সাধারণ কর্মচারীদের জন্য নয়। ফলে কর্মীদের মুনাফার অংশীদারিত্বের অধিকার খর্ব করার জন্য এই ব্যাখ্যা ব্যবহার করা আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।
সাম্প্রতিক অগ্রগতি:
সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ব্যাংকের কর্মীরা বিষয়টি নিয়ে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। পাশাপাশি কারখানা ও স্থাপনা পরিদর্শন অধিদপ্তর (DIFE) কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে WPPF প্রদানের বিষয়ে নির্দেশনাও দিয়েছে বলে জানা যায়।
এর ফলে বিষয়টি এখন কেবল শ্রম অধিকার নয়, বরং ব্যাংকিং খাতে ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা এবং কর্মীদের অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় পরিণত হয়েছে।
শেষকথা
বাংলাদেশের ব্যাংকাররা দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। প্রতিদিন তাঁদের শ্রম, দক্ষতা ও দায়িত্ববোধের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো মুনাফা অর্জন করে। তাই WPPF কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়, বরং আইনের আলোকে প্রাপ্য একটি অধিকার কি না, সেই প্রশ্নের স্পষ্ট ও ন্যায়সঙ্গত সমাধান সময়ের দাবি।
একজন ব্যাংকারের পরিশ্রম হয়তো কারখানার শ্রমিকের মতো দৃশ্যমান নয়, কিন্তু তাঁর শ্রমও প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আর সেই অবদানের যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করাই একটি ন্যায়ভিত্তিক ও আধুনিক কর্মপরিবেশের পূর্বশর্ত।
এ.কে.এম. রোকনুজ্জামান খন্দকার
পিএইচডি গবেষণা ফেলো
ইতিহাস বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়|
Posted ১২:০১ অপরাহ্ণ | সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
9 News Bd | s s