রবিবার ৮ই নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৩শে কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>
হোতারা ক্রমেই বেপরোয়া, ধরপাকড়ে নেতৃত্বদানকারী ভ্যাট মেম্বার হেনস্থা ও ওএসডি: আসছে এনবিআরের নতুন নিতিমালা

অবৈধ সিগারেটে রাজস্ব ক্ষতি বছরে ২০ হাজার কোটি টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   বুধবার, ১০ জুন ২০২৬   |   প্রিন্ট

অবৈধ সিগারেটে রাজস্ব ক্ষতি বছরে ২০ হাজার কোটি টাকা

অবৈধ সিগারেটে রাজস্ব ক্ষতি বছরে বিশ হাজার কোটি টাকা। গত ছয় মাসে বেড়েছে প্রায় ৩১ শতাংশ। স্বাধীনতার পর এমন ভয়াবহ চিত্র দেখা যায়নি। পাড়া মহল্লায়, গ্রাম গঞ্জ হাট বাজার বিদেশী, নকল, নিম্নমানের ভ‍্যাট ফাঁকি দেয়া অবৈধ সিগারেট সয়লাব। এর অধিকাংশ উচ্চ স্তরের নকল ও বিদেশী সিগারেট বেশী। বিভিন্ন জরিপে ১৮ থেকে ২০ বিলিয়ন শলাকা বলা হলেও প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশী। ভ্যাটদাতা দেশীয় বৈধ উৎপাদকগণ মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে।

প্রাকবাজেট সভায় অভিযোগ: 
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর প্রাক বাজেট আলোচনায় এ বিষয়ে অভিযোগ করেছেন উৎপাদক প্রতিষ্ঠান বিএটিবি, জেটিআই, আবুল খায়ের টোবাকো।

ইলিসিট ঠেকাতে হবে:
ব‍ৈধ কারখানা মালিকদের দাবী, ইলিসিট সিগারেট ঠেকাতে হবে। অবৈধ সিগারেটের বাজার দখল বন্ধ করতে না পারলে দক্ষিণ আফ্রিকা, পাকিস্তান, ব্রাজিল, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়ার মতো হবে। দেশের সিগারেট খাত সম্পূর্ণ চোরাকারবারীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে।

এনবিআর চাইলেই পারে:
গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে সারাদেশ ভ‍্যাট কর্মকর্তাদের কড়া নজরদারি, ধরপাকড়, তল্লাশী ও লাগাতার অভিযানের কারণে অবৈধ সিগারেট কেনাবেচা প্রায় বন্ধ ছিল। ওই চার মাসে সরকারের রাজস্বও ব‍্যাপক বৃদ্ধি পায়। এ সময় দেশীয় সিগারেট কারখানা রেকর্ড ব‍্যবসা করে। জুলাই ২০২৫ মাসে বিএটির প্রদেয় রাজস্বের প্রবৃদ্ধি ছিল ৭০১ শতাংশ। জেটিআই ২০০ এবং আবুল খায়ের টোবাকোও ১০০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করে।

ইলিসিট দমনে যেভাবে সাফল্য আসে:
মূলত, দুই মাস সারাদেশে লাগাতার সাড়ে তের হাজার তল্লাশি অভিযানের ফলে এ সাফল্য আসে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তৎকালীন মেম্বার, ভ্যাট বাস্তবায়ন ও আইটি বেলাল হোসাইন চৌধুরী ইলিসিট বা অবৈধ সিগারেটের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেন।
জুলাই মাসকে এনবিআর ভ‍্যাট আদায়ের এনফোর্সমেন্ট মাস ঘোষণা করে। সিগারেটের অবৈধ সিন্ডিকেট ও ভ‍্যাট ফাঁকির মহোৎসব রুখতে ইল্লিসিট বা অবৈধ সিগারেটের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেন। সারাদেশের মাঠ পর্যায়ের ১২টি ভ‍্যাট কমিশনারেটের প্রায় আড়াই হাজার কর্মকর্তা কর্মচারী অবৈধ সিগারেটের বিরুদ্ধে রাতদিন এক ১৩ হাজার ৪০৯টি অভিযান চালায়। অবৈধ সিগারেট বাজার ঢুকতে না পারার ফলে বৈধ সিগারেটের বিক্রয় ব‍্যাপকহারে বৃদ্ধি পায়। ২০২৫-২৬ এর প্রথম প্রান্তিকে এনবিআর সিগারেটের খাত থেকে রেকর্ড ১৫ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা ভ্যাট আদায় করে। গত বছরের একই প্রান্তিকের তুলনায় ৫ হাজার ৩৬৬ কোটি (৬১.৮১ শতাংশ) বেশী।

অঞ্চলভিত্তিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অভিযানে সবচেয়ে শীর্ষে রয়েছে সিলেট কমিশনারেট, যেখানে ৩,৬২১টি অভিযান চালানো হয়েছে। এর পরেই রয়েছে রংপুর ২,৫৫০টি, খুলনা ১,৮৯৭টি, রাজশাহী ১,৩৭৮টি এবং চট্টগ্রাম ১,০৩২টি। এছাড়া ঢাকা অঞ্চলের চারভাগে যথাক্রমে ঢাকা (পশ্চিম) ১,০১৮টি, ঢাকা (দক্ষিণ) ৮৯৭টি, ঢাকা (উত্তর) ৪৪৭টি এবং ঢাকা (পূর্ব) ৩৫৪টি অভিযান পরিচালিত হয়, যেখানে সবচেয়ে কম অভিযান হয়েছে কুমিল্লায় (১৭১টি)। রাজস্ব কর্মকর্তাদের মতে, সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চল মূলত বিদেশি সিগারেট চোরাচালানের প্রবেশপথ, অন্যদিকে রংপুর, কুষ্টিয়া, পাবনা, নাটোর ও বগুড়া অঞ্চল দেশীয় অবৈধ উৎপাদনের বড় কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।

বৈধ কারখানা বন্ধের আশংকা: 
গত সেপ্টেম্বরের পর থেক হঠাৎ অভিযান বন্ধ হয়ে যায়। অবৈধ সিগারেট দ্বিগুন গতিতে প্রবেশ করে। ফলে, বৈধ ফ‍্যাক্টরিগুলো লাভ হারাচ্ছে, সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে।
প্রাকবাজেট সভায় ব্যবসায়ীরা বলেন, এভাবে চলতে থাকলে দক্ষিণ আফ্রিকার মতো সর্ববৃহত রাজস্বের উৎস দেশীয় ফ্যাক্টরিগুলো বন্ধ করে দিতে হবে।

বিশ্লেষক মতামত:
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (PRI), বাজার বিশ্লেষক এবং রাজস্ব খাত সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট সিগারেট বাজারের প্রায় ১৩ থেকে ১৫ শতাংশ এখন সম্পূর্ণ অবৈধ পণ্যের দখলে। সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান বলছে, এই অবৈধ বাজারের অংশ বর্তমানে প্রায় ১৩.১% এবং এর মাধ্যমে প্রতি মাসে দেশের বাজারে প্রবেশ করছে প্রায় ৮৩ কোটি ২০ লাখ শলাকা অবৈধ সিগারেট। বার্ষিক হিসাবে এই পরিমাণ প্রায় ১৮ বিলিয়ন শলাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আরও ভীতিপ্রদ তথ্য হলো, গত মাত্র এক বছরে এই অবৈধ বাজারের প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৩১ শতাংশ। রাজস্ব বিশেষজ্ঞদের মতে, এই লাগামহীন পরিস্থিতি যদি অব্যাহত থাকে, তবে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মিলিয়ে বার্ষিক অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ২০ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।

গত ছয় মাসে ভ‍্যাট আদায় প্রবৃদ্ধি হ্রাস:
একক খাত হিসেবে সিগারেট থেকে সরকার গত বছর সর্বোচ্চ ৩৬ হাজার ৭শ ৬১ কোটি টাকা ভ্যাট আদায় হয়েছে। মে ২০২৬ মাসে গত বছরের একই মাসের তুলনায় ১ হাজার ৫২১ কোটি টাকা কম আদায় হয়েছে।
এনবিআর অর্থবছরের জুলাই থেকে অক্টোবর প্রথম চার মাস সিগারেট খাতের ভ‍্যাট আদায়ে উচ্চাশা জাগায়। প্রথম চার মাসে গত বছরের একসময়ের তুলনায় ৬ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা বা ৭২.৩৮ শতাংশ অতিরিক্ত আদায় হয়। মে ২০২৬ পর্যন্ত এগার মাসে ৫ হাজার ৭৩৬ কোটি টাকা আদায় হয়।

একই এনবিআর এগার মাসে প্রথম চার মাসের (জুলাই-অক্টোবর) তুলনায় ৪২২ কোটি টাকা কম আদায় করেছে। প্রসঙ্গত, এ বছর ৪৭ হাজার ৭৮৯ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ‍্যমাত্রা ধরা হয়েছে। মে পর্যন্ত এগার মাসে ৪০,৯৬০ কোটি টাকা আদায় হয়েছে। গত বছর জুন মাসে ১ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা আদায় হয়। চার মাসে ৬ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা অতরিক্ত আদায় হয়।

সদস্য, ভ্যাট বাস্তবায়ন বদলি ও ওএসডি: 
​অবৈধ তামাক ও সিগারেট সিন্ডিকেট অত্যন্ত শক্তিশালী। এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কাজ করতে গিয়ে অতীতে অনেক সৎ কর্মকর্তা হেনস্থার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তৎকালীন সদস্য (ভ্যাট বাস্তবায়ন) বেলাল হোসাইন চৌধুরীকে গত ৭ অক্টোবর ২০২৫ বদলি করা হয়। একই তারিখে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার বিরুদ্ধে তিন বছর ধরে অনুসন্ধানাধীন একটি বেনামি অভিযোগের ভিত্তিতে আকস্মিক মামলা দায়ের করে। এনবিআরের কয়েকজন কর্মকর্তার দাবি, মামলাটি ইচ্ছাকৃত তথ্যবিকৃতির ভিত্তিতে দায়ের করা হয়েছে। পরে ৯ অক্টোবর তাকে ওএসডি করা হয়। তিনি অবৈধ সিগারেটের বিরুদ্ধে দুই মাসে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার অভিযানে নেতৃত্ব দেন এবং প্রথম চার মাসে শুধু সিগারেট খাত থেকেই ৬ হাজার ১৫২ কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় হয়। এ ঘটনার পর মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সাহস ও মনোবলে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

​রাজস্ব সুরক্ষা ও অবৈধ সিগারেট নিয়ন্ত্রণে করণীয়:
​তামাক খাতের অবৈধ সিন্ডিকেটগুলো অত্যন্ত সুসংগঠিত। তারা আধুনিক প্রযুক্তি, ভুয়া নথি ও জাল ব্যান্ডরোল ব্যবহার করে দ্রুত কার্যক্রম পরিচালনা করে, যা এনবিআরের ম্যানুয়াল পদ্ধতি দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি আধুনিক সংস্কার প্রস্তাব করেছেন—
​১. ট্র্যাক অ্যান্ড ট্রেস সিস্টেম চালু করে উৎপাদন থেকে বিক্রি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ ডিজিটালভাবে পর্যবেক্ষণ করা।
​২. সিগারেট প্যাকেটে কিউআর (QR) কোড সংযোজন করা।
​৩. ডিজিটাল ব্যান্ডরোল মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা।
​৪. এনবিআর, কাস্টমস, পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার সমন্বয়ে স্থায়ী টাস্কফোর্স গঠন করা।
​৫. এআই (AI) ভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ ব্যবস্থা চালু করা।
​৬. কর ফাঁকির সুযোগ কমাতে কর কাঠামো পুনর্বিন্যাস করা।
​৭. অভিযানে অংশ নেওয়া কর্মকর্তাদের আইনি ও প্রশাসনিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অবৈধ সিগারেট শুধু সরকারের বিপুল রাজস্ব ক্ষতির কারণ নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় হুমকি। নিম্নমানের তামাক ও ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে এগুলো বৈধ সিগারেটের চেয়েও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ১:১৬ অপরাহ্ণ | বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

9 News Bd |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

এ বিভাগের আরও খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
শুভ শাহরিয়ার
Contact

৫৫-৫৫/১, রমনা, ঢাকা, বাংলাদেশ।

ফোন : +৮৮০১৯৭১৪৫৮২৫৭

E-mail: info@focusbangla24.com, focusbangla24online@gmail.com